কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পর এবার পারিবারিক জীবনেও দ্রুত বিস্তার ঘটছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির। ঘরের বাজার করা, সন্তানদের পড়াশোনায় সহায়তা, দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে মানসিক সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার। তবে প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলছে, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক এআই কেবল মানুষের নির্দেশনা অনুসরণ করে না; এটি পরিবারের সদস্যদের অভ্যাস, প্রয়োজন এবং দৈনন্দিন রুটিন বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী পরামর্শ ও সহায়তা দিতে সক্ষম। ফলে অনেক পরিবারের কাছে এআই ধীরে ধীরে একজন ‘ডিজিটাল সহকারী’ বা ভার্চুয়াল সদস্যের ভূমিকা পালন করছে।
এআই-এমপাওয়ার্ড মম-এর প্রতিষ্ঠাতা সারা ডুলি বলেন, পারিবারিক জীবনে এআই ব্যবহারের খরচ ও প্রযুক্তিগত জটিলতা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। এ কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিটির গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বাড়ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সুবিধার বিনিময়ে মানুষ অজান্তেই নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার বড় একটি অংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিবারেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি পরিবারে মা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্সা ব্যবহার করলেও, তার সন্তানরা নিয়মিত চ্যাটজিপিটি এবং মানসিক সহায়তামূলক চ্যাটবটের সহায়তা নিচ্ছে। আবার সাত সন্তানের জননী জেসি জেনেটের পরিবারে কেনাকাটা, সন্তানদের শিক্ষা, প্রশাসনিক কাজ এবং আইনি নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় একাধিক এআইভিত্তিক সহকারী ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে, ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআই এমন একটি ডিসপ্লেহীন স্মার্ট স্পিকার তৈরির কাজ করছে, যা ঘরের ভেতরে মানুষের মতো সহচর হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপেও পারিবারিক জীবনে এআইয়ের বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। লুরি চিলড্রেনস হাসপাতালের মে মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৮১ শতাংশ অভিভাবক সন্তান লালন-পালন ও গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনায় কোনো না কোনোভাবে এআইয়ের সহায়তা নিয়েছেন। একই সময়ে পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত চ্যাটবট ব্যবহার করছে।
তবে এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা চ্যাপেল হিলের মনোবিজ্ঞানী অ্যান মাহেক্স বলেন, কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা তাদের বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, মতবিনিময় এবং দ্বন্দ্ব মোকাবিলার দক্ষতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক জীবনে এআই ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং মানবিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন থাকাও সমান জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :