
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাভূমি, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টাঙ্গুয়ার হাওর দিন দিন পরিবেশ দূষণের হুমকিতে পড়ছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো পর্যটক হাওরের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে এলেও অনেকেই ফিরে যাওয়ার সময় রেখে যাচ্ছেন প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, পানীয়ের ক্যান ও মদের খালি বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এতে হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওর পরিদর্শনে গিয়ে এমন চিত্র দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ইয়াছিন আলী খান। হাওরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যের স্তূপ তার নজরে আসে।
তিনি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের নয়, পুরো দেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ কিছু পর্যটকের দায়িত্বহীন আচরণের কারণে এই সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে এসে অনেকে ব্যবহৃত প্লাস্টিক, পলিথিন, পানীয় ও মদের বোতল ফেলে রেখে যাচ্ছেন, যা হাওরের পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইয়াছিন আলী খান আরও বলেন, একসময় টাঙ্গুয়ার হাওর ছিল মাছ ও অতিথি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত পর্যটন এবং অসচেতনতার কারণে ধীরে ধীরে সেই জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই হাওরের সৌন্দর্য শুধু ছবিতেই দেখতে পাবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতনদের অভিযোগ, পর্যটকদের অসচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারির অভাব, পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণে ইতোমধ্যে সুরক্ষা আদেশ (Protection Order) জারি করা হয়েছে। যেহেতু এটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত, তাই ভূমির দাগ, মৌজা ও খতিয়ানভিত্তিক তথ্য নির্ধারণ করে এ সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। তবে দেশের অন্যান্য হাওরে একই ধরনের সুরক্ষা আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি-তথ্য নির্ধারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংবাদিক ইয়াছিন আলী খান বলেন, কেবল সুরক্ষা আদেশ জারি করলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। হাওরে পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং পর্যটকদের সচেতন করতে ধারাবাহিক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
তিনি পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে সেটিকে নষ্ট না করে নিজের ব্যবহৃত প্লাস্টিক, বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলতে অথবা সঙ্গে করে ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করা গেলে টাঙ্গুয়ার হাওর, এর জীববৈচিত্র্য এবং দেশের পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
পরিবেশবিদদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করা এবং প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের সমন্বিত উদ্যোগই টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অন্যথায় দেশের অন্যতম এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে তার স্বকীয়তা হারাবে এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
আপনার মতামত লিখুন :