
চিরচেনা ঘাটে নেই আগের সেই হাঁকডাক। নেই চায়ের দোকানের আড্ডা, গান-বাজনার শব্দ কিংবা বরফ ভাঙার পরিচিত আওয়াজ। সবকিছু যেন থমকে গেছে। ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা না পাওয়ায় নোয়াখালীর হাতিয়ার জেলে, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের চোখেমুখে এখন হতাশার ছাপ।
ইলিশ শিকারের মৌসুম এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত হলেও এ বছর কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। প্রতিদিন নদীতে গিয়ে শূন্য হাতে ঘাটে ফিরতে হচ্ছে তাদের। এতে হাতিয়ার ২০টি ঘাটে ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত লক্ষাধিক মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন।
জেলেরা জানান, প্রতি বছর ইলিশের ভরা মৌসুমে হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ, বন্দরটিলা, সুইজের ঘাট, মোক্তারিয়া, দানারদোল, সূর্যমুখী, কাজীরবাজার, বাংলাবাজার ও চেয়ারম্যানঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায়। এ বছরও ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার জেলে নৌকা নদীতে নামে। কিন্তু আশানুরূপ মাছ না পাওয়ায় অনেক নৌকা এখন ঘাটে অলস পড়ে আছে।
সূর্যমুখী ঘাটে কথা হয় ভোলা জেলার দৌলতখা থেকে আসা জেলে আব্দুল আলীর সঙ্গে। প্রায় ৬০ বছর বয়সী এই জেলে জানান, ভালো মাছের আশায় দেড় মাস আগে হাতিয়ায় এসেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আয় করতে পারেননি। তার সঙ্গে থাকা ১০ মাঝি-মাল্লার সংসারও চলছে কষ্টে।
আব্দুল আলী বলেন, নদীতে যেতে প্রতিদিন জ্বালানি ও খাবারের খরচ হচ্ছে। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় দেনা বাড়ছে। পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু জেলেরা নন, সংকটে পড়েছেন ঘাটের শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাও। সূর্যমুখী ঘাটে মাছ বহনের কাজে থাকা শ্রমিক নবির সর্দার জানান, আগে প্রতিদিন মাছ ওঠানামার কাজে ভালো আয় হতো। এখন কোনো দিন ২০০ টাকা, আবার কোনো দিন তার চেয়েও কম টাকা ভাগে আসে। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাতিয়া সূর্যমুখী মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক জানান, হাতিয়ায় প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এর মধ্যে জেলে পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। নদীতে মাছ না থাকায় জেলে পরিবারগুলোর পাশাপাশি ঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক জেলে নৌকা নদীতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যারা যাচ্ছে, তারাও অনেক সময় সামান্য মাছ নিয়ে ফিরছে। এতে প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, ভরা মৌসুমে ইলিশ কম পাওয়ার পেছনে জাটকা নিধন, মা ইলিশ ধরা, নদীর পরিবর্তন, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থাকতে পারে। উপকূলীয় নদীগুলোতে শিল্পবর্জ্যের প্রভাবও মাছের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে মৌসুমের পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। ইলিশের আশায় থাকা হাতিয়ার জেলেদের এখন একটাই অপেক্ষা—কবে আবার নদী ভরে উঠবে রূপালি ইলিশে, কবে ফিরবে ঘাটের সেই হারানো কর্মচাঞ্চল্য।
আপনার মতামত লিখুন :