খেপুপাড়া খাদ্য গুদামে দায়িত্ব গ্রহণে বিলম্ব: শান্তি রঞ্জনের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘন ও ঘুষের অভিযোগ
বরিশাল ব্যুরো খান আরিফ :
প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ৬:০২ অপরাহ্ণ
সরকারি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া খাদ্য ঘুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে যোগদান করিলেও বদলি হওয়ার চার মাস পরও চার্জ বুজে নেননি শান্তি রঞ্জন দাস। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে ৯এপ্রিল থেকে ১২ জুন পর্যন্ত কর্মস্থলে না গিয়ে বরিশাল শহরেই অবস্থান করছেন তিনি।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী বদলির ৭ দিনের মধ্যে যোগদান বা দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কর্মকর্তাদের ‘ক্ষমতার কারিশমায়’ থমকে আছে আইনি প্রক্রিয়া।বদলির আদেশ ও ৪ মাসের লুকোচুরি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২ মার্চ শান্তি রঞ্জন দাসকে খেপুপাড়া খাদ্য ঘুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। সরকারি চাকুরি বিধি অনুযায়ী, আদেশ জারির ৭ কর্যদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান ও দায়িত্ব বুজিয়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যথায় বদলি আদেশ স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
কিন্তু শান্তি রঞ্জন দাস চার মাস পার হয়ে গেলেও দায়িত্ব বুজে নেননি। সচিব সুত্রে জানাগেছে, গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে খাদ্য সচিব মোঃ ফিরোজ সরকার মৌখিকভাবে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সকল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের (আরসি ফুড) খাদ্য গুদামে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) হিসেবে পদায়ন না করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এই নির্দেশনা জারির মাত্র একদিন পরেই অর্থাৎ ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ আঃ কাদের ০৭ নং স্মারকে আওয়ামী লীগকে পূর্নবাসন করতে আমতলীতে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক শান্তি রঞ্জনের বদলি আদেশ জারি করেন।
অভিযোগ উঠেছে,জ্যেষ্ঠতা , দক্ষতা বিবেচনায়া না নিয়ে, বদলির আবেদন না করা সত্ত্বেও ছাত্রলীগ কর্মী শন্তি রঞ্জন দাসকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের বিনিময়ে তাকে খেপুপাড়া খাদ্য গুদামে বদলি করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের পদায়ন দাপ্তরিক ‘ডি-নথি’র (উরমরঃধষ ঘড়ঃযর) মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার নিয়ম থাকলেও, এই ক্ষেত্রে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সরাসরি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আদেশটি জারি করেন। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে জারি করা এই আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরেও বিতরণ করা হয়নি। জানা গেছে, খেপুপাড়া খাদ্য গুদামে বদলি হওয়ার জন্য ৫ জন খাদ্য পরিদর্শক আবেদন করেছিলেন।
কিন্তু তাদের আবেদন অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শান্তি রঞ্জনকে সেখানে পদায়ন করায় বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, সৎ ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে পকেট ভারী করতেই এমন লুকোচুরি করা হয়েছে।দুর্নীতির এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে সদ্য বদলি হাওয়া খাদ্য সচিব মোঃ ফিরোজ সরকারকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, বিদায়ই অভিযুক্ত আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (বরিশাল) মোঃ আঃ কাদেরকেও একাধিকবার ফোন দেওয়া হলে তাকে পাওয়া যায়নি। অর্থের বিনিময়ে বদলি পাওয়া আলোচিত খাদ্য পরিদর্শক শান্তি রঞ্জনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি “একটি অনুষ্ঠানে আছেন” বলে তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ কেটে দেন। খাদ্য মন্ত্রনালয়ের ১৪ ডিসেম্বর ১২-২০২২ খ্রি: তারিখের ৫০৯ নংস্মারকের বদলি নীতিমালা ২০১৯ (সংশোধিত-২০২২) অনুযায়ী, বদলির আদেশ জারির সাত কার্যাদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্টি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নতুন কর্মস্থালে যোগদান ও দায়িত্বগ্রহন/হস্তন্তর করতে হয়।অন্যথায় তাকে তাৎক্ষনিক অবমুক্ত হিসাবে গণ্য বিধান রয়েছে। একই সাঙ্গে আদেশ অমান্য করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা কথাও উল্লেখ আছে।
অথচ শান্তিরঞ্জন দাস ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসাবে খেপুপাড়া খাদ্যঘুদামে যোগদান করলেও এখন পর্যন্ত দায়িত্বগ্রহণ করেন নাই।অভিযোগ উঠেছে, পটুয়াখালী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো: নাসির উদ্দিন, খেপুপাড়া উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তিনি এই নিয়মবহির্ভূত সুবিধা ভোগ করছেন।
কর্মকর্তাদের দায়সারা ও অসংলগ্ন বক্তব্য দীর্ঘ চার মাসেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে, পটুয়াখালী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো: নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “আসলে বদলি আদেশ হওয়ার সাথে সাথেই তো দায়িত্ব নেওয়া যায় না, একটু সময় লাগে।” সরকারি নীতিমালা কি তবে অকার্যকর? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সদুত্তর না দিয়ে বলেন, “আমরা চলতি সপ্তাহের মধ্যে তার দায়িত্ব বুজে নেওয়ার ব্যবস্থা করব।” তবে দায়িত্ব নেওয়ার আইনি সময়সীমা পার হওয়ার পর বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে কীভাবে তাকে নতুন করে দায়িত্ব বুজিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো আইনগত ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
এদিকে বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক নকিব সাদ সাইফুল ইসলাম নিজের দায় এড়াতে গিয়ে বলেন, “আমি এখানে মাত্র এক মাস হলো এসেছি। এই বদলি আদেশ আমার আসার আগের। জেলা বা উপজেলা কর্মকর্তা কেন এতদিন কোনো উদ্যোগ নেননি, তা তারা ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি উপরস্থ কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানিয়েছি। এখনো কোনো উত্তর পাইনি, দেখি তিনি কী করেন।
সরকারি আদেশ অমান্য করা এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের নীরবতার বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। মহাপরিচালক জানান, “আমি বিষয়টি এখনো জানি না। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে চার মাস পরেও দায়িত্ব বুজিয়ে না নেওয়া এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এই রহস্যজনক নীরবতায় স্থানীয় সচেতন মহলের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন :