
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার তিন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলার তিনটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্বজনরা। কান্না, আহাজারি আর অনিশ্চয়তায় ভারী হয়ে উঠেছে নিহতদের বাড়ির পরিবেশ।
নিহতরা হলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৫), আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (৪০) এবং কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের সঞ্জয় দাসের ছেলে শুভ দাস (২৩)।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় একটি রুটি বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ওই তিন বাংলাদেশি। তারা একই এলাকায় বসবাস ও কাজ করতেন।
মঙ্গলবার সকালে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের এক কোণে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল আমার স্বামী। এত ঋণ করে গেছে, এখন আমি কীভাবে সন্তানদের নিয়ে বাঁচব?”
শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে আহাজারি করছিলেন। বাবা আফসার আলীও শোকে বাকরুদ্ধ। তিনি বলেন, “ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি, এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। ভেবেছিলাম ছেলে সংসারের কষ্ট দূর করবে, কিন্তু এখন সে লাশ হয়ে ফিরবে।”
পরিবার জানায়, গত ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন পরই শফিকুল লেবাননে যান। সেখানে একটি ফলের বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিদেশে যেতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল ঋণ।
এদিকে নাহিদুল ইসলাম নাহিদের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা জানান, পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্যই তিনি প্রবাসে গিয়েছিলেন। একই অবস্থা শুভ দাসের বাড়িতেও। তিনটি পরিবারই এখন ঋণের বোঝা আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছে। ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, “শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছে। আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জেলার তিন যুবকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু তাদের পরিবার নয়, পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আপনার মতামত লিখুন :