
শিক্ষা সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন এখন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন ঘিরে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত হলেও দেশজুড়ে এর প্রভাব বাড়ছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি তরুণ নেতৃত্বাধীন সংগঠন। সোমবার (২০ জুলাই) দিল্লিতে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে হাজারো তরুণ-তরুণী অংশ নেন। তারা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ৬০ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ১১৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
দিল্লির পাশাপাশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। কেরালায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষ দিল্লিতে এসে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেছেন, আন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
সিজেপি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন, যা চলতি বছরের শুরুতে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমে যুক্ত বেকার তরুণদের বোঝাতে তিনি ‘কাকরোচ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, তার মন্তব্য ভুয়া ও বানোয়াট ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশ্যে ছিল।
আন্দোলনকারীরা গত এক মাস ধরে দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন। ২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসে। পরে পুলিশ তাকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সিজেপির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। বিশেষ করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা এনইইটি’র প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তারা শিক্ষামন্ত্রীর নৈতিক দায়ের কথা তুলে ধরছে।
এদিকে, বিরোধী দলগুলো আন্দোলনকারীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুববিরোধী নীতির অভিযোগে সমালোচনা করেছেন।
সোমবারের সহিংসতার পর সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিজেপির শীর্ষ নেতা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে বৈঠক থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পাথর নিক্ষেপ ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসহ সহিংস আচরণ করেছে। তবে সিজেপি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীই প্রথমে হামলা চালিয়েছে।
সিজেপি জানিয়েছে, পুলিশি বাধা ও সহিংসতার পরও তাদের আন্দোলন চলবে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের উদ্দেশে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের অসন্তোষের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশাল জনসমাগম ও আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
আপনার মতামত লিখুন :