প্রতিবছরই কেন ভাঙে নদীর পাড়? জানুন নদীভাঙনের আসল কারণ


অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুন ৩০, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
প্রতিবছরই কেন ভাঙে নদীর পাড়? জানুন নদীভাঙনের আসল কারণ

বর্ষা মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় নদীভাঙন। মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পুরো গ্রামও। প্রতি বছর হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হন। কিন্তু নদীভাঙনের পেছনে কী কাজ করে? শুধু বর্ষার অতিবৃষ্টিই কি এর কারণ, নাকি রয়েছে আরও নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রভাব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙন মূলত একটি স্বাভাবিক ভূ-প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক এলাকায় এর তীব্রতা বেড়েছে।

নদীভাঙন কী?

নদীর প্রবল স্রোত ও পানির চাপে নদীতীরের মাটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়াকে নদীভাঙন বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে। একদিকে পাড় ভাঙলেও অন্যদিকে পলি জমে নতুন চর বা ভূমির সৃষ্টি হয়।

বর্ষায় কেন বাড়ে ভাঙন?

বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির কারণে নদীর প্রবাহ ও স্রোতের গতি বেড়ে যায়। তখন নদীর বাঁক কিংবা দুর্বল তীরে পানির চাপ বেশি পড়ে। ফলে মাটি ধসে নদীগর্ভে চলে যায়। বিশেষ করে বড় নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো এ সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

নদীর স্রোত কীভাবে পাড় ভাঙে?

নদী সাধারণত সোজা পথে প্রবাহিত হয় না; বিভিন্ন স্থানে বাঁক তৈরি হয়। বাঁকের বাইরের অংশে পানির স্রোতের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই চাপের ফলে তীরের মাটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় এবং একসময় বড় অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়।

মাটির ধরনও গুরুত্বপূর্ণ

সব ধরনের মাটির স্থায়িত্ব এক নয়। বালুমিশ্রিত বা আলগা মাটি পানির চাপে সহজেই ভেঙে যায়। তুলনামূলকভাবে শক্ত কাদামাটি বেশি সময় টিকে থাকে। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীতীর নরম পলিমাটি দিয়ে গঠিত হওয়ায় এসব এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বেশি।

মানুষের কর্মকাণ্ডে বাড়ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন, নদীতীর দখল, প্রাকৃতিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের মতো কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে নদীভাঙনকে আরও তীব্র করে তুলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলের ঘটনা বেড়েছে। এতে নদীতে পানির প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়, যা নদীভাঙনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

নদীভাঙনের প্রভাব

নদীভাঙনের ফলে প্রতিবছর বহু মানুষ বাড়িঘর ও কৃষিজমি হারান। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। অনেক পরিবার জীবিকা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, যার ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও সৃষ্টি হয়।

ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নিয়মিত নদী খনন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই তীররক্ষা ব্যবস্থা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং আগাম সতর্কতা জোরদারের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে নদীভাঙন পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।