
আজকের দিনে সিগারেটকে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও ধূমপান করেন। কিন্তু এই অভ্যাসটি কীভাবে মানুষের জীবনে জায়গা করে নিল—তার পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত এক দীর্ঘ ইতিহাস।
তামাকের ব্যবহার প্রথম শুরু হয় আমেরিকা মহাদেশে। ইউরোপীয়দের আগমনের বহু আগে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা ধর্মীয় আচার, চিকিৎসা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে তামাক ব্যবহার করতেন। তারা পাইপে ধূমপান করতেন বা শুকনো তামাকপাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া গ্রহণ করতেন। তখন আধুনিক সিগারেটের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা অভিযানের পর ইউরোপীয়রা প্রথম তামাকের সঙ্গে পরিচিত হয়। তার অভিযাত্রীরা তামাকের বীজ ও পাতা ইউরোপে নিয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তামাক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুরুতে এটিকে অনেকেই ঔষধি হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং মাথাব্যথা, দাঁতের ব্যথা বা সর্দি-কাশির চিকিৎসায় ব্যবহার করতেন।
বর্তমান রূপের কাগজে মোড়ানো সিগারেটের প্রচলন শুরু হয় উনিশ শতকে। ধারণা করা হয়, স্পেনে সিগার তৈরির পর অবশিষ্ট তামাক কাগজে মুড়িয়ে ধূমপানের অভ্যাস থেকেই সিগারেটের জন্ম হয়, যা পরে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৮০ সালে স্বয়ংক্রিয় সিগারেট তৈরির যন্ত্র আবিষ্কারের পর উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। আগে হাতে তৈরি সীমিত সিগারেটের জায়গায় অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ সিগারেট তৈরি সম্ভব হয়, ফলে দাম কমে গিয়ে এটি সাধারণ মানুষের কাছেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও সিগারেটের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অনেক দেশের সেনাদের রেশন সামগ্রীর সঙ্গে সিগারেট দেওয়া হতো। যুদ্ধ শেষে সৈনিকদের একটি বড় অংশ সেই অভ্যাস নিয়েই ঘরে ফেরেন।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রচারণার মাধ্যমে সিগারেটকে আধুনিকতা, ব্যক্তিত্ব ও সফলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সিনেমা ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ধূমপানকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়, যা এর ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে ১৯৫০-এর দশক থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ধূমপানের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ধরা পড়ে। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়, সিগারেট ফুসফুস ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ নানা মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। এমনকি পরোক্ষ ধূমপানও আশপাশের মানুষের জন্য ক্ষতিকর।
বর্তমানে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই ধূমপান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন রয়েছে। সতর্কবার্তাসহ প্যাকেট, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষেধাজ্ঞা ও উচ্চ কর আরোপের মাধ্যমে এর ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে। তবুও প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেটের ইতিহাস দীর্ঘ হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে এখন আর কোনো বিতর্ক নেই। তাই সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে ধূমপান থেকে দূরে থাকা এবং নতুন প্রজন্মকে সচেতন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত লিখুন :