
মাত্র দেড় টাকা পুঁজি আর একটি দা দিয়ে প্রায় তিন দশক আগে কাঠের কলম তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন ফকিরহাট উপজেলার ধনপোতা গ্রামের এক পরিবার। ছোট সেই উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে ‘মিথুন কুঠির শিল্পে’। হাতের দক্ষতা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে তৈরি এই কাঠের কলম এখন দেশের বাজার পেরিয়ে বিদেশেও সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
প্রায় ৩০ বছর আগে শুরু হওয়া এই কুটির শিল্প বর্তমানে প্রযুক্তি ও নান্দনিকতার সমন্বয়ে তৈরি করছে বিভিন্ন ধরনের কাঠের কলম। ব্যবহারকারীদের মতে, সরু ও মসৃণ এসব কলম দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে লেখা যায়। অনেকে শখের সংগ্রহ হিসেবেও রাখেন এসব কলম।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফকিরহাট উপজেলার প্রত্যন্ত ধনপোতা গ্রামে মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে নান্দনিক ও টেকসই কলম। শুরুতে বাঁশ দিয়ে কলম তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে কাঠের কলম তৈরিতে দক্ষতা অর্জন করেছে পরিবারটি। দুই ভাই অসিত পাল ও অরুণ পালসহ পরিবারের সদস্যরাই পরিচালনা করছেন এই কুটির শিল্প।
অশোক পাল জানান, ১৯৯৪ সালে মাত্র দেড় টাকা দিয়ে একটি শিষ ও একটি শিরিস কাগজ কিনে প্রথম কলম তৈরি শুরু করেন তিনি। সেটিই ছিল তার প্রথম পুঁজি। তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। তৈরি করা কলম বিক্রির জন্য মাসের পর মাস বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শহরের বিপণি বিতানে ঘুরেছেন। বিভিন্ন মেলা ও পথের ধারে বসেও বিক্রি করেছেন নিজের তৈরি পণ্য।
ধীরে ধীরে তাদের তৈরি কলমের মান ও সৌন্দর্যের কারণে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাদের দুটি কারখানায় মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার কলম উৎপাদন হয়। পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন সদস্য এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। একটি কলম তৈরি করতে প্রায় ৩৬টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
তবে উৎপাদনের পথে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। অরুণ পাল জানান, প্রতি ১ হাজার কলমে প্রায় ২০০টি উৎপাদনজনিত ত্রুটির কারণে বাতিল হয়ে যায়। এতে খরচ বেড়ে যায় এবং লাভ কমে আসে। উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা পেলে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
মিথুন কুঠির শিল্পে তৈরি বিভিন্ন নকশার কাঠের কলম পাইকারি পর্যায়ে ১৬ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। সাধারণ কলমের পাশাপাশি রয়েছে কারুকাজ করা বিশেষ নকশার কলম। তবে উৎপাদকদের অভিযোগ, তারা ন্যায্য দাম না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা এসব পণ্য কয়েকগুণ বেশি দামে বাজারজাত করছে।
অশোক পাল বলেন, তাদের তৈরি কলমের চাহিদা থাকলেও সরাসরি বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত। ফলে উৎপাদনকারীরা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি জানান, ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের তৈরি কলম যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতেও পৌঁছেছে এবং ভালো সাড়া পেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে কলম কিনে বিদেশে পাঠায়। তবে সরাসরি রপ্তানির সুযোগ না পাওয়ায় তারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।
বিদেশের বাজারে যেতে গিয়ে কিছু সমস্যার কথাও জানান তিনি। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে কিছু ধরনের শিষের কালি জমে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে। উন্নত মানের কালি ও শিষ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়াকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন তারা।
তাদের দাবি, সরকারি বা বিসিকের কারিগরি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরাসরি রপ্তানির সুযোগ পেলে এই কুটির শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে। অরুণ পাল জানান, ভারতের কলকাতার বিভিন্ন বিপণি, যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের কাঠের কলমের চাহিদা রয়েছে। তবে বর্তমানে সীমান্ত জটিলতার কারণে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সহজ ব্যবস্থাপনা করা গেলে দেশও রাজস্ব পাবে বলে তিনি মনে করেন।
ফকিরহাট কাজি আজহার আলি কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ মল্লিক বলেন, কাঠের তৈরি এসব কলম প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি ব্যবহারে আরামদায়ক। প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ধনপোতার এই কাঠের কলম একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়াতে পারে।
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ জামান বলেন, কাঠের কলম তৈরির এই উদ্যোগ একটি ব্যতিক্রমধর্মী কুটির শিল্প। তাদের সমস্যাগুলো খোঁজ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। বিশেষ করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :