দুর্নীতির আখড়া পাটগ্রাম এলজিইডি: সিন্ডিকেটে জিম্মি সরকারি উন্নয়ন


পাটগ্রাম প্রতিনিধি, মিনাজ ইসলাম প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ৪:৪২ অপরাহ্ণ
দুর্নীতির আখড়া পাটগ্রাম এলজিইডি: সিন্ডিকেটে জিম্মি সরকারি উন্নয়ন

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে জেঁকে বসায় এখানে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। স্থানীয় ঠিকাদারদের সাথে গভীর সখ্যতা তৈরি করে সরকারি প্রকল্পের টাকা হরিলুট, পার্সেন্টেজ বাণিজ্য এবং অফিসের সরকারি মালামাল চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। এতে উন্নয়ন কাজের চরম গুণগত মানহীনতা প্রকাশ পাওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তদবিরের জোরে বছরের পর বছর একই স্থানে বহাল রয়েছেন। এদের মধ্যে সাব-ইঞ্জিনিয়ার সৌরভ কুমার ৪ বছর, মানিক মিয়া ৫ বছর, ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট আনোয়ার হোসেন ৭ বছর এবং আহসান হাবীব ৫ বছর ধরে এই উপজেলায় কর্মরত। বাকি কর্মচারীদের অনেকেই অন্যত্র বদলি হলেও পুনরায় তদবিরের মাধ্যমে আবার পাটগ্রামেই ফিরে এসেছেন। দীর্ঘদিন একই স্টেশনে থাকার কারণে ঠিকাদারদের সাথে তাদের প্রকাশ্য যোগসাজশ তৈরি হয়েছে, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়েও এই দপ্তরে আওয়ামীলীগ পন্থী হিসেবে পরিচিত সুবিধাভোগী কিছু ঠিকাদারের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রয়েছে। তারা পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব ও এলজিইডির অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন এবং ইচ্ছেমতো কাজ পরিচালনা করছেন।

​চলতি অর্থ বছরে পাটগ্রামে ২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে, যার মধ্যে এডিবির বরাদ্দ ৮০ লক্ষ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের এডিপি বরাদ্দের ১০ শতাংশ টাকা সরাসরি প্রকৌশলী দপ্তর কেটে রাখে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী আহমেদ হায়দার জামানকে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ না দিলে কাজ নিখুঁত হলেও বিভিন্ন ত্রুটি ধরে হয়রানি করা হয়। এমনকি বিল উত্তোলনের ফাইলে স্বাক্ষর নিতে গেলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়, যার কারণে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও টাকা দিতে বাধ্য হন।

​অনুরূপ বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে পাটগ্রামের বাউরা ইউনিয়নে বাস্তবায়নধীন ‘অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির সহনশীলতা বৃদ্ধি (প্রভাতি)’ প্রকল্পে। ১ কোটি ১৯ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার এই প্রকল্পে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করিয়েছেন প্রকৌশলী আহমেদ হায়দার জামান। শুধু তাই নয়, কাগজে-কলমে বেশি শ্রমিক ও কাজের উচ্চ হার দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, অথচ চুক্তিবদ্ধ প্রকৃত শ্রমিকদের বরাদ্দকৃত কাজ কমিয়ে দিয়ে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

​অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি অফিসের সরকারি মালামাল উধাও করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে এই দপ্তরে। সহকারী প্রকৌশলী সৌরভ কুমারের দায়িত্বে থাকা পাটগ্রাম খেংটি বানিয়াডাঙ্গী পাবসস অফিসের ১০টি ভিজিট চেয়ার, ১টি কম্পিউটার টেবিল, ১টি স্টিল আলমারি, ১টি অফিস টেবিল ও ১টি মিটিং টেবিল স্থানীয় এক ঠিকাদারের জিম্মায় রাখা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৌশলী সৌরভ কুমার ও ওই ঠিকাদার যোগসাজশ করে সরকারি এসব আসবাবপত্র বাইরে বিক্রি করে দিয়েছেন। বিষয়টি পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেন নিশ্চিত হয়ে উপজেলা প্রকৌশলীকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে অফিস তহবিল থেকে পুনরায় মালামাল কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এলজিইডি অফিস, যা প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের সখ্যতার বিষয়টি জনসমক্ষে স্পষ্ট করে তুলেছে।

​এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-ইঞ্জিনিয়ার মানিক মিয়া বলেন, ঠিকাদারদের সাথে কাজ বুঝে নেওয়ার বাইরে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই এবং বদলির বিষয়টি সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী আহমেদ হায়দার জামান দাবি করেছেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা তথ্যগুলো সত্য নয়। অন্যদিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে লালমনিরহাট জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সিয়েন) কায়সার আলম জানান, কমিশন বা পার্সেন্টেজ নেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই এবং কোনো ঠিকাদারও এ বিষয়ে অভিযোগ করেননি। তবে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

​সংশ্লিষ্ট মহল ও স্থানীয় জনগণের দাবি, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পাটগ্রাম এলজিইডিতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবিলম্বে অন্যত্র বদলি করা দরকার। একই সাথে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এই দপ্তরের সার্বিক দুর্নীতি খতিয়ে দেখে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।