কালজানির ভাঙনে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে শতাধিক পরিবারের


অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : জুন ৭, ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
কালজানির ভাঙনে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে শতাধিক পরিবারের

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ ধলডাঙ্গা গ্রামে কালজানি নদীর ভয়াবহ ভাঙনে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত মানুষ। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনপদের অবকাঠামো। ঘরবাড়ি হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে।

স্থানীয়দের দাবি, গত চার দিনে কালজানি নদীর অব্যাহত ভাঙনে দুই গ্রামের প্রায় ২০০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ধলডাঙ্গার প্রায় ৮০টি এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গার ৩৫টি পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তীব্র স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় প্রায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ফলে সীমান্তঘেঁষা এ জনপদের মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় শনিবার (৬ জুন) বিকেলে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ। এ সময় জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ইতোমধ্যে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার বাইরে যেন আর কোনো বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন না হয়, সে লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। রোববার থেকে ভাঙন প্রতিরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে দুই হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, প্রথম ধাপে দুই হাজার জিও ব্যাগ সরবরাহ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জিও ব্যাগ আরও দেওয়া হবে।

এদিকে চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নদীভাঙন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকাংশই কোনো কার্যকর সহায়তা পায় না। তাই এ বিষয়ে একটি স্থায়ী আইন ও পুনর্বাসন কাঠামো জরুরি।

শিলখুরি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন জানান, গত এক বছরে কালজানি নদী বাম তীর থেকে প্রায় ১০০ মিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। চলতি বছরেই প্রায় এক হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে এলাকার ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় এবং বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তোজাম্মেল হক, ময়েন উদ্দিন, সাহেজ উদ্দিন ও মনির হোসেন বলেন, প্রতিদিন নদী তাদের জীবন-জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের একটাই দাবি— দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে নদীভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হোক। কালজানির ভয়াল আগ্রাসনে যখন একের পর এক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, তখন ভাঙনরোধে দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপই হয়ে উঠেছে এই জনপদের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।