মহাকাশ গবেষণায় নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সংস্থাটির অত্যাধুনিক জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের সরাসরি ছবি তুলে নতুন ইতিহাস গড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সাফল্য শুধু একটি ছবি ধারণের ঘটনা নয়, বরং জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা।
ওয়েব দূরবীক্ষণ যন্ত্র যে গ্রহটির ছবি তুলেছে, তার নাম এইচআইপি ৬৫৪২৬ বি। এটি একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ, যার কোনো কঠিন পাথুরে পৃষ্ঠ নেই। ফলে সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খুবই কম বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দূরবর্তী গ্রহগুলোর গঠন, আবহাওয়া ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওয়েব দূরবীক্ষণ যন্ত্র চারটি ভিন্ন অবলোহিত ফিল্টার ব্যবহার করে গ্রহটির ছবি ধারণ করেছে। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আলাদাভাবে ধরা পড়ায় প্রতিটি ছবিতে গ্রহটিকে ভিন্নভাবে দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও অজানা বহির্গ্রহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সাশা হিঙ্কলি। তিনি বলেন, এটি শুধু ওয়েব দূরবীক্ষণ যন্ত্রের জন্য নয়, পুরো জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্যই একটি রূপান্তরমূলক মুহূর্ত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এইচআইপি ৬৫৪২৬ বি–এর ভর বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় ৬ থেকে ১২ গুণ বেশি। গ্রহটির বয়স মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি বছর, যা মহাজাগতিক হিসাবে তুলনামূলকভাবে নবীন। অন্যদিকে পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫০ কোটি বছর।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয় দক্ষিণ মানমন্দিরের ভেরি লার্জ দূরবীক্ষণ যন্ত্র প্রথম গ্রহটির অস্তিত্ব শনাক্ত করেছিল। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমাবদ্ধতার কারণে তখন বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এবার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য তুলে এনেছে জেমস ওয়েব। বিজ্ঞানীরা জানান, গ্রহটি তার মূল নক্ষত্র থেকে পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্বের প্রায় ১০০ গুণ দূরে অবস্থান করছে। ফলে বিশেষ ‘করোনাগ্রাফ’ প্রযুক্তির সাহায্যে নক্ষত্রের তীব্র আলো আড়াল করে সহজেই গ্রহটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ছবিগুলোর বিশ্লেষণে নেতৃত্ব দেওয়া গবেষক এরিন কার্টার বলেন, প্রথমে শুধু নক্ষত্রের আলোই দেখা যাচ্ছিল। পরে ধাপে ধাপে সেই আলো সরিয়ে যখন গ্রহটিকে দেখা গেল, তখন মনে হচ্ছিল যেন মহাকাশের কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছি। বিজ্ঞানীদের আশা, ওয়েব দূরবীক্ষণ যন্ত্রের এই যুগান্তকারী সাফল্য ভবিষ্যতে দূরবর্তী গ্রহ অনুসন্ধানকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করে তুলবে। একই সঙ্গে মহাবিশ্বের অজানা অসংখ্য গ্রহের সন্ধানও মিলতে পারে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।
আপনার মতামত লিখুন :