‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু’


অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : মে ৭, ২০২৬, ৪:১৮ অপরাহ্ণ
‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু’

‘বাবারে কিন্তু আমি বুকে নিয়া বাসায় যামু’, ‘আমি তো বাবারে এমনে আনি নাই, এখন এমনে কেমনে নিয়া যামু’— রাজধানীর হাসপাতালে সন্তানের মরদেহ সামনে রেখে এভাবেই বিলাপ করছিলেন পাঁচ মাস বয়সী শিশু মো. তাকরিমের মা আমেনা বেগম। পাশে দাঁড়িয়ে বাবা মো. মহসীন কাঁদতে কাঁদতে নিজের মাকে ফোনে বলছিলেন, “মা, তোমার নাতিরে আল্লায় নিয়া গেছে গো।”

বুধবার (৬ মে) সকালে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ হাম ও এর জটিলতায় মারা যায় শিশু তাকরিম। স্বজনরা জানান, গত এক মাস ধরে ভোলা থেকে ঢাকা—এভাবেই চলছিল শিশুটির চিকিৎসার লড়াই। জ্বর, কাশি ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে প্রথমে তাকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলেও শুরুতে কেউ হাম শনাক্ত করতে পারেননি বলে অভিযোগ পরিবারের।

তাকরিমের বাবা মহসীন বলেন, “ডাক্তারেরে বারবার জিজ্ঞেস করছি বাচ্চাটার হাম হইছে কিনা। তারা শুধু বলছে অ্যালার্জি। যদি আগে হাম ধরা পড়ত, তাহলে আরও আগে ঢাকায় আনতাম।” পরে শিশুটিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা হাম ও হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতার কথা জানান। তবে শিশুটির জন্য পিআইসিইউ প্রয়োজন হলেও সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় পরে তাকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউ ও পিআইসিইউ বিভাগের সিনিয়র রেজিস্ট্রার মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, শিশুটিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও সকাল ১০টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ, মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও রক্তে পটাশিয়ামের ঘাটতিসহ একাধিক জটিলতায় আক্রান্ত ছিল তাকরিম। এছাড়া তার হৃদযন্ত্রেও ছিদ্র ছিল।

চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন অটোরিকশাচালক বাবা মহসীন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তিনি জানিয়েছিলেন, কেউ চিকিৎসার দায়িত্ব নিলে সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য তাকেও দিয়ে দিতে রাজি আছেন। পরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। তার পক্ষ থেকে হাসপাতালের কয়েক লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয় এবং পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।

তবু শেষরক্ষা হয়নি। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে কাফনে মোড়ানো ছোট্ট মরদেহ নিয়ে ভোলার পথে রওনা দেন বাবা-মা। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার আগে বারবার ছেলের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠছিলেন মা আমেনা বেগম—“বাবা আমার আগে কেন চইল্যা গেল।”