
সবুজে ঘেরা বৃক্ষরাজি, আঁকাবাঁকা নদী-খাল আর জলে সারি সারি ভাসমান নৌকার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত চিত্রপট। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলা, যা এখনও সবার কাছে স্বরূপকাঠি নামেই বেশি পরিচিত, এমনই এক মনোমুগ্ধকর জনপদ। সন্ধ্যা ও বেলুয়া নদীঘেরা এই অঞ্চল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভাসমান হাট, কাঠের আড়ত, নার্সারি শিল্প, নৌকা নির্মাণ, মৃৎশিল্প ও শীতলপাটির জন্য দেশব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে।
বর্ষা মৌসুমে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসজুড়ে কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভীমরুলী এলাকার খালগুলো রূপ নেয় ভাসমান পেয়ারা বাজারে। নৌকায় করেই চাষিরা বাগান থেকে সদ্য সংগ্রহ করা পেয়ারা এনে বিক্রি করেন। মৌসুম শেষে একই বাজারে জমে ওঠে সুস্বাদু আমড়ার বেচাকেনা। এই ব্যতিক্রমী বাজারের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে আসেন।
স্বরূপকাঠির অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ভাসমান কাঠের আড়ত। সন্ধ্যা নদী ও এর শাখা খালজুড়ে বিস্তৃত এই কাঠের বাজার দেশের বৃহত্তম কাঠ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি। এখান থেকে লোহাকাঠ, মেহগনি, রেইনট্রি, চাম্বলসহ বিভিন্ন প্রজাতির কাঠ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
নদীনির্ভর জনজীবনের চাহিদাকে কেন্দ্র করে আটঘর-কুড়িয়ানা ও জিন্দাকাঠি এলাকায় গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ শিল্প। অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতে তৈরি ডিঙি, কোষা নৌকা ও ট্রলার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে।
নার্সারি শিল্পেও স্বরূপকাঠি দেশের অন্যতম অগ্রগামী এলাকা। আকলম, অলংকারকাঠি, সংগীতকাঠি ও কুড়িয়ানাসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা হাজারো নার্সারিতে উৎপাদিত ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা দেশের নানা প্রান্তের চাহিদা পূরণ করছে। একই সঙ্গে এই শিল্প হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের মধ্যে গোনমান গ্রামের মৃৎশিল্প এবং মুর্তা বেতের তৈরি শীতলপাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিকতার প্রভাবে এসব শিল্প কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও স্বরূপকাঠি সমৃদ্ধ। মিয়া বাড়ি মসজিদ, প্রাচীন জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ছারছীনা দরবার শরীফ, অলংকারকাঠী সরকারবাড়ির পঞ্চরত্ন মঠ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থান ইতিহাস ও সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
তবে সম্ভাবনাময় এই জনপদ এখনও নানা সমস্যায় জর্জরিত। নদীর নাব্যতা সংকট ও ভরাটের কারণে বড় কার্গো নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সহজ শর্তে ঋণের অভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত আবাসন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে পর্যটন খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, নদীর নাব্যতা সংরক্ষণ, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে স্বরূপকাঠি দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের নিরলস পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই জনপদ তাই আগামী দিনের সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আপনার মতামত লিখুন :