কলমাকান্দায় কাগজে-কলমে ১২৭ শ্রমিক, মাঠে পঞ্চাশের নিচে — খাল খনন করেছে ভেকু!


কলমাকান্দা উপজেলা প্রতিনিধি, জুয়েল  প্রকাশের সময় : জুন ১৮, ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ
কলমাকান্দায় কাগজে-কলমে ১২৭ শ্রমিক, মাঠে পঞ্চাশের নিচে — খাল খনন করেছে ভেকু!

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের দমদমা খাল পুনঃখনন প্রকল্পে শ্রমিক উপস্থিতি, কাজের বাস্তবায়ন এবং তদারকি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মসৃজন কর্মসূচি (ইজিপিপি) আওতাধীন এ প্রকল্পে কাগজে ১২৭ জন শ্রমিকের নাম থাকলেও মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে ৫০ জনেরও কম শ্রমিক কাজ করছেন।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ধাপে দমদমা খাল পুনঃখননের জন্য ৫১ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রায় ১ হাজার ৫২০ মিটার দীর্ঘ খালটির কাজে ১২৭ জন শ্রমিক নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে। শ্রমিকপ্রতি দৈনিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ৪০ কর্মদিবস।

প্রকল্পের তথ্যফলকে উল্লেখ রয়েছে, গত ১৮ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ৬ জুন শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ এখনো চলমান থাকায় প্রকল্পের অগ্রগতি ও তদারকি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খাল খননের পরিবর্তে শ্রমিকরা খালের পাড়ে মেহগনি গাছের চারা রোপণের কাজে ব্যস্ত। সেখানে উপস্থিত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ জন, যা প্রকল্পে উল্লেখিত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম।

শ্রমিকদের দাবি, ৪০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ২৪ দিনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, খালের মূল খননকাজ শ্রমিকদের দিয়ে না করিয়ে ভেকু (খননযন্ত্র) ব্যবহার করে করা হয়েছে। পরে তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের পাড় সংস্কার ও বৃক্ষরোপণের কাজে নিয়োজিত করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের তালিকাভুক্ত অনেক শ্রমিককে কখনোই কাজে দেখা যায়নি। এমনকি কয়েকজন শ্রমিককে প্রকল্প এলাকার বাইরে অন্য একটি গ্রামীণ কাঁচা সড়কের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পে কর্মরত কয়েকজন আদিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্দারের নাম জানেন না। হাজিরা খাতা কোথায় রাখা হয় বা কীভাবে উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়, সে সম্পর্কেও তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

এ বিষয়ে খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশাদ মিয়া বলেন, দমদমা খালের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং বর্তমানে গাছের চারা রোপণের কাজ চলছে। তবে প্রতিদিন ১২৭ জন শ্রমিক কাজ করার কথা থাকলেও মাঠে কম শ্রমিক থাকার কারণ তিনি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।

তিনি জানান, প্রকল্পটির দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে। কিন্তু হাজিরা খাতা কার কাছে, কীভাবে উপস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে কিংবা নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক কেন মাঠে নেই—এসব প্রশ্নেরও নির্দিষ্ট জবাব দিতে পারেননি।

খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক বলেন, ৪০ দিনের কর্মসূচির নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে। বর্তমানে যারা কাজ করছেন, তারা অতিরিক্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

অন্যদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মমিনুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা খনন ও সংস্কারকাজে দায়িত্ব পালন করছেন। একটি প্রকল্পের শ্রমিককে অন্য প্রকল্প বা স্থানে কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ নেই।

তবে ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য এবং শ্রমিকদের বক্তব্যে একাধিক বিষয়ে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শ্রমিক সংখ্যা, কাজের ধরন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে আসায় প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।