
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে চীন। অরুণাচল প্রদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে নির্মিতব্য এই প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে নিজেদের কৌশলগত প্রস্তুতি জোরদার করছে নয়াদিল্লি।
শুক্রবার (১৯ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের নির্মাণাধীন মেডোগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন ক্ষমতা হবে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারত অরুণাচল প্রদেশের আপার সিয়াং ও সিয়াং জেলায় প্রস্তাবিত সিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এনএইচপিসি পরিচালিত এই প্রকল্পের সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার মেগাওয়াট, যা বাস্তবায়িত হলে ভারতের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে।
ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি রুপির সমপরিমাণ।
তবে দুই দেশের প্রকল্পের অগ্রগতিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। চীনের মেডোগ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেলেও ভারতের প্রকল্প এখনো সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। নির্মাণ-পূর্ব কার্যক্রমও শুরু হয়নি।
ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতে প্রবেশ করার পর সিয়াং নামে পরিচিত হয় এবং পরে ব্রহ্মপুত্র নদীতে রূপ নেয়। নদীটি অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের লাখো মানুষের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উজানে এত বড় বাঁধ নির্মিত হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি পার্লামেন্টে জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিম্ন অববাহিকার মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, তথ্য বিনিময় এবং আগাম পরামর্শের বিষয়ে চীনের ওপর চাপ দিয়ে আসছে ভারত। তবে এ ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সিয়াং আপার বহুমুখী প্রকল্প শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়; বরং সম্ভাব্য পানি প্রত্যাহার, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্নাঞ্চলের বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। এদিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নদী পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজও জোরদার করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :