
নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি ও দেশীয় আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এক প্রশংসনীয় ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলার দ্বীপচাঁদপুর আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সফল মৎস্য চাষি মো. আব্দুল জলিল তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে বিলসৌঁতি বিল, কচুয়া বিল ও গজমত খালি উন্মুক্ত জলাশয়ে বিপুল পরিমাণ মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন। শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল ৯টায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে জলাশয়গুলোতে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ও উৎপাদনে প্রস্তুতকৃত ২ মেট্রিক টন (প্রায় ৫০ মণ) মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।
জানা যায়, প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিলের নিজস্ব পুকুর রয়েছে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের পোনা উৎপাদিত হয়। বাণিজ্যিক ভাবে এই পোনা বিক্রি না করে, এলাকার সাধারণ মানুষের কল্যাণ এবং বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষার কথা চিন্তা করে তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে এই বিশাল পরিমাণ পোনা উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।
দ্বীপচাঁদপুর আর এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল জলিল বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি মৎস্য চাষ আমার একটি প্রিয় শখ। এবার আমার নিজস্ব পুকুরে আল্লাহর রহমতে প্রচুর পরিমাণে মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের পোনা উৎপাদিত হয়েছে। এই পোনাগুলো বাজারে বিক্রি করলে হয়তো আমি আর্থিকভাবে লাভবান হতাম,
কিন্তু সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আমি তা করিনি। কচুয়া বিল, বিলসৌঁতি বিল ও গজমত খালি দহ আমাদের এলাকার একটি বড় উন্মুক্ত জলাশয়। এখানে পোনাগুলো অবমুক্ত করার মূল উদ্দেশ্য হলো, এগুলো বড় হলে এলাকার দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ অবলীলায় মাছ ধরে তাদের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা মেটাতে পারবে। এলাকার মানুষের কল্যাণে এই উদ্যোগ নিতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বিশিষ্ট পুকুর ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মো. আসাদুজ্জামান টফি বলেন, মৎস্য চাষি হিসেবে আমি জানি ২ মেট্রিক টন পোনার বাজারমূল্য কতখানি। বর্তমান বাজারে এত বড় অঙ্কের মুনাফা ত্যাগ করে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা ছেড়ে দেওয়া সত্যিই এক বিরল ও মহৎ দৃষ্টান্ত।
প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিল সাহেব যে উদারতা দেখিয়েছেন, তা আমাদের এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী ও সমাজসেবকদের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে গজমত খালি বিল আবার মাছে মাছে ভরে উঠবে এবং এলাকার মৎস্যজীবীদের ভাগ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. হাজ্জাস হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিল সাহেবের এই উদ্যোগকে আমরা এলাকাবাসী আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। বর্ষা মৌসুমে বিলের পানি বাড়ার এই সময়ে এত বিপুল পরিমাণ পোনা অবমুক্ত করায় বিলের মৎস্য সম্পদ অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করি, বিলের এই মাছগুলো যাতে কেউ অবৈধ কারেন্ট জাল বা চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে অকালেই নিধন করতে না পারে, সেজন্য এলাকাবাসী ও প্রশাসন সম্মিলিতভাবে সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারের পাশাপাশি এমন ব্যক্তিউদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল জলিল যে কাজটি করেছেন তা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২ মেট্রিক টন মনোসেক্স তেলাপিয়ার পোনা এই তিনটি বিলে অবমুক্ত করার ফলে এই অঞ্চলের মৎস্য সম্পদে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এই পোনাগুলো যাতে বড় হওয়ার সুযোগ পায় এবং কেউ যেন নিষিদ্ধ কারেন্ট বা চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে নিধন করতে না পারে, সে ব্যাপারে নিয়মিত তদারকি ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এদিকে, একজন শিক্ষকের নিজ অর্থায়নে ও উদ্যোগে উন্মুক্ত জলাশয়ে ২ মেট্রিক টন মাছের পোনা অবমুক্তকরণের এই মহতী ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা জানান, এই উদ্যোগের ফলে গজমত খালি ও বিলসৌঁতি বিলের আশেপাশের কয়েক হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। উপজেলা মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের প্রশংসা করে জানিয়েছেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি সমাজের বিত্তবান ও সফল মৎস্য চাষিরা এভাবে উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্তকরণে এগিয়ে আসেন, তবে দেশের মৎস্য উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
আপনার মতামত লিখুন :