
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট, নদীভাঙন ও কৃষি উৎপাদন সীমাবদ্ধতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে কৃষি, কর্মসংস্থান, নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের অনুমোদিত প্রকল্পটি সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে এবং ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার ১৬১টি উপজেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিবর্তন আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২ লাখ হেক্টরের বেশি এক ফসলি জমি দুই ফসলি এবং ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের কাছে পর্যাপ্ত মিঠা পানি পৌঁছানো সম্ভব হবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষি গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে বোরো ধানের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৪.৫-৫ টন থেকে বেড়ে ৬-৭ টনে উন্নীত হতে পারে। পাশাপাশি গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় গুদামজাতকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগার, পরিবহন ও বিপণন খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে এক থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পদ্মা ব্যারাজ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। প্রতিবছর নদীভাঙনের কারণে শত শত হেক্টর কৃষিজমি ও অসংখ্য বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত ড্রেজিং, তীর সংরক্ষণ বাঁধ এবং আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে নদীভাঙনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ ও দ্রুত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে নদী তীরবর্তী লাখো মানুষ এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি সুরক্ষা পাবে। রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে কৃষি, অর্থনীতি এবং নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :