
দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করায় স্বস্তি ফিরেছে লাখো গ্রাহকের মধ্যে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, যারা সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে গত ৩ জুন গণশুনানির মাধ্যমে সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সে সময় খুচরা পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যও বাড়ানো হয়েছিল।
ঘোষণা অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে জনস্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) বিইআরসির কাছে লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য আগের মূল্যহার বহাল রাখার আবেদন জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মূল্য সমন্বয়ের একদিন পর কমিশন এই দুই শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য পূর্বের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব থেকে মুক্ত থাকছেন।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার তাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি জানান, নতুন মূল্য কাঠামো কার্যকর হলেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম বলেন, মাসে তার প্রায় ৩০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হলে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা তার পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে যেত। আগের মূল্যহার বহাল রাখায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন জানান, তার বাড়িতে কয়েকটি বাতি, ফ্যান, একটি ফ্রিজ ও পানির মোটর রয়েছে। মাসে প্রায় ৫০০ টাকা বিল আসে। দাম না বাড়ানোয় সংসারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুবিধা হবে। যশোরের ঝিকরগাছার গ্রাহক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনও সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বিদ্যুতের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য আগের মূল্যহার বহাল রাখা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত সংস্কার ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। একই সঙ্গে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের দাম সমন্বয় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সামাজিক সুরক্ষা ও জনস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :