
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার তিতাস-মেঘনা অববাহিকায় ছোট-বড় নদী, খাল ও বিলের নাব্যতা সংকটের কারণে বিলুপ্তির পথে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। একসময় মাছ ও নৌ যোগাযোগের জন্য সমৃদ্ধ এই অঞ্চল বর্তমানে দখল, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
নবীনগর উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান একসময় ছিল নদী-খালবেষ্টিত। তিতাস, মেঘনা, বুড়ি ও পাগলা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল জেলে পল্লী ও সমৃদ্ধ মৎস্যজীবী সমাজ। অদ্বৈত মল্লবর্মনের বিখ্যাত উপন্যাস “তিতাস একটি নদীর নাম”-এ এই অঞ্চলের জেলে জীবনের চিত্রও উঠে এসেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাল-বিল ও নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে হারিয়ে ফেলেছে তাদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
একসময় এই উপজেলায় অসংখ্য হাওড়, জলাশয় ও খাস পুকুর ছিল, যা দেশীয় মাছের প্রজনন ও অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করত। বাঙ্গরা বাজার থেকে সাতমোড়া, শ্যামগ্রাম, বড়িকান্দি, সলিমগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বিস্তৃত নৌপথগুলো ছিল স্থানীয় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। পালতোলা নৌকা চলাচল করত এসব খাল-বিলে, যা এখন প্রায় বিলুপ্ত।
স্থানীয়দের মতে, দখল, দূষণ ও কচুরিপানা বৃদ্ধির কারণে নদী-খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশীয় মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়ে প্রজাতি দ্রুত কমে যাচ্ছে। একসময় যেসব হাটবাজারে ৫০টিরও বেশি দেশীয় মাছ পাওয়া যেত, সেখানে এখন চাষের মাছই প্রধান হয়ে উঠেছে।
রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোল, কই, মাগুর, শিং, পাবদা, টাকি, বাইমসহ বহু প্রজাতির মাছ একসময় নবীনগরের জলাশয়ে সহজলভ্য ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ভরাট, অতিরিক্ত আহরণ, কীটনাশকের ব্যবহার, দূষণ ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা এখন ২৬০টিরও বেশি প্রজাতি থেকে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
নবীনগরের জেলে সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন জীবিকা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। গোপীনাথপুরের জেলে সুনীল বর্মন বলেন, নদ-নদীর নাব্যতা সংকটে তাদের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। সরকারি জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ ও প্রণোদনা পেলে তারা আবার দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও চাষে যুক্ত হতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নবীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আক্কাস আলী জানান, খাল-বিলের নাব্যতা হ্রাস, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, কীটনাশক প্রয়োগ, বর্জ্য ফেলা এবং জলাশয় সেচে মাছ ধরা—এসব কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে এই অঞ্চলে আড়াই শতাধিক দেশীয় মিঠাপানির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে অধিকাংশই বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাজারে দেশীয় মাছের জায়গা দখল করে নিয়েছে চাষের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও কার্প জাতীয় মাছ।
আপনার মতামত লিখুন :