স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ বছরের পথচলা


স্টাফ রিপোর্টার, জাকিয়া বেগম প্রকাশের সময় : জুন ২, ২০২৬, ৪:৪১ অপরাহ্ণ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ বছরের পথচলা

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের বুকে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সংগ্রাম, প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। ২০২৬ সালের ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়টি তার ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। এই উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম, বিকাশ, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ত্রিশালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বহু বছরের পুরোনো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদকে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষানুরাগী মহল ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও প্রচেষ্টা চালিয়ে আসেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৫ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্বোধন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ত্রিশালের স্থানীয় জনগণের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমি দান থেকে শুরু করে আন্দোলন-সংগ্রামে একত্রিত অংশগ্রহণ—সবকিছুই এই প্রতিষ্ঠার ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গ এবং বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের নিরলস প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত।

আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৬ সালের ৯ মে। তবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালের ৩ জুন। শুরুতে মাত্র দুটি অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিভাগগুলো ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, সংগীত এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রথম ব্যাচে প্রায় ১৮৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় এর শিক্ষা কার্যক্রম।

সীমিত অবকাঠামো, জনবল ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ৫৭ একর বিস্তৃত ক্যাম্পাসে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের এক প্রাণবন্ত পরিবেশ গড়ে উঠেছে।

বর্তমান অনুষদসমূহ হলো—কলা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ব্যবসায় প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞান, চারুকলা এবং আইন অনুষদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিভাগ, অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রম যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি ও গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি নজরুলচর্চা ও গবেষণার জন্য ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

গত প্রায় দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশেষ করে নজরুলচর্চা, বাঙালি সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সাফল্য প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেছে।

তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন ছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল, উন্নত গ্রন্থাগার, পর্যাপ্ত আবাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ত্রিশালের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এসেছে। তবে ত্রিশালকে একটি পরিকল্পিত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নগরীতে রূপান্তরের যে স্বপ্ন ছিল, তা এখনো পূর্ণতা পায়নি। সম্প্রতি ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার উদ্যোগ নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যা বাস্তবায়িত হলে ত্রিশাল একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষা-সংস্কৃতি ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক, গবেষণামুখী ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে সিন্ডিকেট সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের সক্রিয় ভূমিকা ত্রিশালবাসীর মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহী চেতনার আদর্শ ধারণ করেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। আগামী দিনে এটি আন্তর্জাতিক মানের নজরুল গবেষণা কেন্দ্র এবং বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে—যদি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।

১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন, স্থানীয় জনগণের ত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাকে নতুন করে স্মরণ করার সময় এসেছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে।

ত্রিশালের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি স্বপ্নের নাম। ১৯ বছরের এই পথচলা আজ গর্বের, প্রেরণার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত।