আগুন কয়লা শব্দে নতুন প্রাণ ঈদ ঘিরে মুখর নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী সিংহাসনপুর কামারপল্লী।


মোঃআজিজুর রহমান, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি। প্রকাশের সময় : মে ২২, ২০২৬, ৫:৪৭ অপরাহ্ণ
আগুন কয়লা শব্দে নতুন প্রাণ ঈদ ঘিরে মুখর নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী সিংহাসনপুর কামারপল্লী।

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী কামারপল্লীগুলো। বিশেষ করে জেলার সিংগাশোলপুর বাজারের কামারশালাগুলোতে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই কারিগরদের। আগুন, কয়লা আর হাতুড়ির ঠনঠন শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোহা পেটানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে স্থানীয় কামারশিল্পীদের।

সিংগাশোলপুর বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট ছোট টিনশেডের দোকান। কোথাও আগুনে লাল হয়ে থাকা লোহা, কোথাও হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে নতুন দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটি। আবার কোথাও পুরোনো সরঞ্জামে শান দিতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। স্থানীয়দের ভাষায়, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এই কামারপল্লী যেন নতুন করে জেগে ওঠে।

স্থানীয় কামারশিল্পীরা জানান, ঈদকে ঘিরে কয়েক সপ্তাহের আয় দিয়েই অনেক পরিবার বছরের বড় একটি সময়ের খরচ চালান। এখানকার তৈরি দা, ছুরি, চাপাতি, বঁটি ও কৃষি সরঞ্জামের সুনাম রয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য যাচ্ছে খুলনা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরসহ দেশের নানা প্রান্তে।

স্থানীয় বাসিন্দা রওশন আলী বলেন, “শৈশব থেকেই দেখে আসছি এই বাজারের কামারশিল্পীদের কাজ। তাদের তৈরি সরঞ্জামের মান খুব ভালো হওয়ায় ঈদের সময় এখানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।” এই বাজারে বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি কামার পরিবার বংশানুক্রমে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদেরই একজন ৮৪ বছর বয়সী প্রবীণ কারিগর নিরাপদ বিশ্বাস। স্বাধীনতার আগের সময় থেকে তিনি এ পেশায় রয়েছেন। বয়সের ভারে ভারী কাজ করতে না পারলেও এখনো দোকানে বসে ছেলেকে পরামর্শ দেন তিনি।

একই বাজারের আরেক প্রবীণ কারিগর স্বপন সরকার জানান, সারা বছর কাজ থাকলেও ঈদের সময় ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তার দোকানে দা, ছুরি, বঁটি, কাঁচি, কোদাল, হাইশো ও চাপড়া চাকুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে ঐতিহ্যের এই শিল্প এখন নানা সংকটের মুখে। কামারশিল্পীরা জানান, লোহা ও কয়লার মতো কাঁচামালের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী পণ্যের দাম বাড়ছে না। ফলে লাভ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

নড়াইল বিসিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন কামারশিল্পী রয়েছেন। বিসিক নড়াইলের উপব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. সোলাইমান হোসেন বলেন, “নড়াইলের কামারশিল্পীদের কাজের মান অত্যন্ত ভালো। জেলার বাইরেও তাদের তৈরি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের উন্নয়ন ও কারিগরদের সহযোগিতার বিষয়ে বিসিক আন্তরিকভাবে কাজ করছে।” সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও সিংগাশোলপুর বাজারের কামারপল্লীতে এখনো ঘাম, শ্রম আর দক্ষতার বিনিময়ে টিকে আছে শত বছরের পুরোনো গ্রামীণ ঐতিহ্য।