
খুলনার রূপসা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা নূরুল বাছেদ শিকদারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, বিসিজি স্টেশন জাবুসা’র পেটি অফিসার আসাদুল বারী (ইআরএ- ৪, সরকারী সংখ্যা- ২০০৫০৫৫০), এম. গোলাম রব্বানী (সরকারী সংখ্যা- ২০১০০৪২০), টুটুল হোসাইন (আরইএন- ১, সরকারী সংখ্যা- ২০১৭০২৮৪) এবং পশ্চিম জোনের শেখ জাফর ইকবাল (ইআরএ- ৪, সরকারী সংখ্যা- ৯৯০৩৭৫), মোহাম্মদ রাকিব (টপ- ১, সরকারী সংখ্যা- ২০১৫০৫৯৫), মোহাম্মদ সানী আলম (ইএন- ১, সরকারী সংখ্যা- ২০১৫০৭৬০), এম. মুনতাসির (এবি, সরকারী সংখ্যা- ২০১৮১০৭৮), এম. আসাদুল (আরওজি- ১, সরকারী সংখ্যা- ২০১৮০৪১২) ও রাজিব নামীয় সদস্যের সহযোগিতায় মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মিথ্যা মামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী, কোস্টগার্ড সদর দপ্তর, কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনাল কমান্ডার, মহাপরিচালক র্যাব ফোর্সেস ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন ফাতেমা বেগম নামে এক নারী। জলদস্যু বাছেদ শিকদারের অত্যাচারের শিকার আলাইপুর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি খুলনার বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানা গেছে। এছাড়াও ওছিকার খান (৪৫), মেহেদী (২২), পিয়াস (৩৫), শফিউল্লাহ (৪২) ব্যক্তিগণও জলদস্যু বাছেদ শিকদারের যোগসাজশে কোস্টগার্ডের মিথ্যা মামলায় হয়রানি হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন।
ফাতেমা বেগমের অভিযোগপত্র অনুযায়ী জানা যায়, নূরুল বাছেদ শিকদার একসময় সুন্দরবন অঞ্চলের জলদস্যু ‘রাজু বাহিনী’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, লুট-তরাজ, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ২০১৭ সালে সুন্দরবনে জলদস্যু বিরোধী অভিযানে র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, বিসিজি স্টেশন, জাবুসা’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে আবারও এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফাতেমা বেগম তার আবেদনে দাবি করেন, বাছেদ শিকদার কোস্টগার্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, অস্ত্র ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র দিয়ে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়, রূপসা থানাধীন আলাইপুর গ্রামে কোস্টগার্ডের অভিযানে প্রায়ই অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা দেখানো হলেও স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনায় বাছেদ শিকদারের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এমনকি কোস্টগার্ডের ব্যবহৃত গাড়িতে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগে কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্যের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা সরাসরি বাছেদ শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং তার বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এসব কারণে এলাকায় তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে দাবি গ্রামবাসীর।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে মোহাম্মদ আলী শিকদারের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে অভিযোগপত্রে। সেখানে বলা হয়, গত ৩০ মার্চ সকালে ভাড়া করা ভ্যানে করে মাছের পোনা বিক্রির উদ্দেশ্যে ডুমুরিয়ায় যাওয়ার পথে তাকে রূপসার খানজাহান আলী ব্রিজ সংলগ্ন রুপা ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে সাজানো মাদক উদ্ধার অভিযানে আটক করা হয়। পরে ওই ভ্যানে ইয়াবা দেখিয়ে কোস্টগার্ডের মাধ্যমে গ্রেপ্তার করানো হয়। এ ঘটনায় বর্তমানে মামলা চলমান রয়েছে। ঘটনার দিন ওই ভ্যানের চালক ছিলেন বাছেদ শিকদারের মামা হেজবুল্লাহ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভ্যান চালক বাছেদ শিকদারের মামা হওয়ায় তাকে অজ্ঞাত কারনে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন কোস্টগার্ডের সদস্যরা। উল্লেখ্য, এ অভিযানের কিছুদিন আগে জলদস্যু বাছেদ শিকদার উপরোক্ত মোহাম্মদ আলীকে কোস্টগার্ডের মাধ্যমে অস্ত্র ও মাদক দিয়ে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিলে মোহাম্মদ আলী বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর আদালত নং-০১, খুলনায় একটি মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং সিআর- ৩১/২৫। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, বাছেদ শিকদারের বিরুদ্ধে খুলনা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর আগেও খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
আলাইপুর গ্রামবাসী সরাসরি বাছেদ শিকদারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস না পেলেও সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় গোপনে তথ্য দিতে শুরু করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গ্রামবাসী জানিয়েছেন, জলদস্যু নুরুল বাছেদ শিকদার অত্যন্ত হিংস্র প্রকৃতির মানুষ। তার নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী আছে। কোস্টগার্ডের সহযোগিতায় বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন মাছ বোঝাই ট্রলার ছিনতাই করে নিয়ে এসে আলাইপুরে আনলোড করেন। পরে তার চক্রের সদস্যদের দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সেই মাছ বিক্রি করেন। তার বিরুদ্ধে যদি কেউ মুখ খোলেন, শুরু হয়ে যায় অমানবিক নির্যাতন ও হামলা-মামলা। তার হামলা-মামলা ও অত্যাচারের শিকার হয়ে গ্রাম ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন একাধিক পরিবার দাবি এলাকাবাসীর।
সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকে জলদস্যু নূরুল বাছেদ শিকদার আত্মগোপনে চলে গেছেন বলেও বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি কিংবা অভিযুক্ত কোস্টগার্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেও দেখা যায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি শর্ষের ভিতরেই ভূত? এই ভূত তাড়াতে না পারলে সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করবেন কি করে প্রশ্ন সচেতনমহলের। এদিকে গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র্যাব সদর দপ্তর ও কোস্টগার্ড সদর দপ্তরের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিঃ দ্রঃ ধারাবাহিক তৃতীয় পর্ব…
আপনার মতামত লিখুন :