সাতক্ষীরায় বাড়ছে ক্যান্সার রোগী, বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাবে দিশেহারা মানুষ


খুলনা ব্যুরো, বরুণ ব্যানার্জী প্রকাশের সময় : মে ১৮, ২০২৬, ১:০৫ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় বাড়ছে ক্যান্সার রোগী, বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাবে দিশেহারা মানুষ

সাতক্ষীরা জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। স্থানীয় সচেতন মহল ও উন্নয়নকর্মীদের মতে, বর্তমানে জেলায় ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি হতে পারে। তবে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য সরকারি হাসপাতালে এখনো গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা। ফলে উন্নত চিকিৎসার আশায় রোগীদের ছুটতে হচ্ছে ঢাকা, খুলনা কিংবা ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে অনেক পরিবার।

জেলায় পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার না থাকায় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতীয় গড় অনুযায়ী সাতক্ষীরায় ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আড়াই হাজারের মতো হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।

স্থানীয় উন্নয়নকর্মী শেখ আফজাল হোসেন জানান, উপকূলীয় আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তাঁর মতে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আট হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে ব্লাড ক্যান্সার, স্তন, ফুসফুস, কিডনি, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের সুযোগ সীমিত থাকায় অধিকাংশ রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে এখনো পূর্ণাঙ্গ অনকোলজি বিভাগ চালু হয়নি। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পর্যাপ্ত সুবিধাও নেই। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা দূরবর্তী শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূমপান, জর্দা-গুল সেবন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ এবং পরিবেশ দূষণের কারণে সব বয়সী মানুষের মধ্যেই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে।

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী পল্টু বাসার বলেন, ২০২৩ সালে তাঁর রোগ শনাক্ত হয়। শুরুতে আত্মীয়স্বজন ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় চিকিৎসা চালালেও বর্তমানে তিনি চরম অর্থসংকটে রয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “ক্যান্সার শুধু শারীরিক যন্ত্রণা নয়, এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ।”

দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরায় ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধা চালুর দাবিতে আন্দোলন করছে জেলা নাগরিক কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক শেখ আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, “এত বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও অন্তত একটি ১০ শয্যার ক্যান্সার ইউনিট চালু না হওয়া দুঃখজনক।”

এদিকে ক্যান্সার রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহের দাবিতে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে নাগরিক কমিটি।

নাগরিক নেতা ইদ্রিস আলী বলেন, “ক্যান্সার এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলার মানুষ আর অবহেলার শিকার হতে চায় না। দ্রুত আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও নির্ভরযোগ্য ক্যান্সার ডাটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি।”

সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মনোয়ার হোসেন। সাতক্ষীরার এই কৃতি সন্তান নিজ উদ্যোগে বিনেরপোতা এলাকায় জমি কিনে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। হাসপাতালটি চালু হলে স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।