অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পেয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চূড়ান্ত অনুমোদন। দেশের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ রক্ষা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এই প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একনেকের সর্বশেষ সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প অনুযায়ী, প্রথম ধাপে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ। এটি হবে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু একটি বৃহৎ অবকাঠামো, যা শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে।
এই প্রকল্পের আওতায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কৃষি, মৎস্য উৎপাদন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নকশায় রয়েছে আধুনিক ও বহুমুখী অবকাঠামো ব্যবস্থা। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক, দুটি ফিশ পাস এবং একটি রেলওয়ে সেতু। পাশাপাশি ব্যারাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবে হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট, যার মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা কমিশন জানায়, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ শতাংশ এই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হবে। প্রকল্পটি চারটি বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে রয়েছে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে এবং লবণাক্ততা বাড়ছে। এর ফলে কৃষি, সুপেয় পানি সরবরাহ, মৎস্য সম্পদ এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে এসব সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে মূল ব্যারাজ নির্মাণসহ গড়াই-মধুমতি ও হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদী পুনঃখননের কাজ হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি নদী পুনরুদ্ধারসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
প্রথম ধাপেই দুটি হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে, যার মাধ্যমে ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ও গড়াই অফটেক থেকে আরও ৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার নদী খনন, ২৪৬ কিলোমিটারেরও বেশি নিষ্কাশন পুনঃখনন এবং শত শত কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে—বার্ষিক ধান উৎপাদন প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা। শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে এনে লবণাক্ততা কমানো গেলে সুন্দরবনের কেওড়া, গেওয়া এবং অন্যান্য উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
তবে এই বিশাল প্রকল্প ঘিরে কিছু অনিশ্চয়তাও রয়েছে। বিশেষ করে ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যারাজ নির্মাণের ফলে উজানে ক্ষয় এবং ভাটিতে পলি জমার মতো পরিবেশগত ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক নকশা, আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশে এটি হবে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা।
সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কৌশলের একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের কোটি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং দীর্ঘদিনের পানিসংকটের স্থায়ী সমাধান আসবে।
আপনার মতামত লিখুন :