সমুদ্রে কোটি টাকার মাছ, তবু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে সাতক্ষীরার জেলেরা


খুলনা ব্যুরো, বরুণ ব্যানার্জী প্রকাশের সময় : মে ১৩, ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সমুদ্রে কোটি টাকার মাছ, তবু দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছে সাতক্ষীরার জেলেরা

বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন গভীর সমুদ্রে যান সাতক্ষীরার হাজারো জেলে। ঝড়, বৈরী আবহাওয়া ও জলদস্যুর আতঙ্ক মাথায় নিয়েই তারা উপকূল থেকে ৮০-৯০ কিলোমিটার দূরে মাছ শিকারে নামেন। তাদের ধরা রূপচাঁদা, ভোল, লইট্যা কিংবা ছুরি মাছের বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও, সেই মাছ শিকার করা জেলেদের বড় একটি অংশ এখনও মানবেতর জীবনযাপন করছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালা উপজেলার বহু পরিবার সরাসরি গভীর সমুদ্রের মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ হাজার। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন। তবে তালিকার বাইরে আরও লক্ষাধিক অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, যারা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে বর্তমানে চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এ সময়ে সমুদ্রে মাছ আহরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে উপকূলের জেলেপাড়াগুলোতে নেমে এসেছে কর্মহীনতা ও হতাশা।

সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলেদের ৫৮ দিনের জন্য বিশেষ ভিজিএফ সহায়তা হিসেবে জনপ্রতি ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। তবে জেলেদের দাবি, শুধু চাল দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়।

আশাশুনির প্রতাপনগরের জেলে শাহজাহান সরদার জানান, বছরের দীর্ঘ সময় তারা গভীর সমুদ্রে অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি করেন। কিন্তু মৌসুম শেষে সংসার চালাতে ঋণ ও দাদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি বলেন, “১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা ধারদেনার মধ্যেই বেঁচে আছি।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় ডাকাতদের হাতে জেলেরা জিম্মিও হন। এক কেজি ভোল মাছ ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও সেই লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের জেলে আজগর আলী বলেন, “টানা ৫৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। চাল পেলেও অন্যান্য খরচ মেটানো অসম্ভব হয়ে যায়।”

আরেক জেলে তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য, “প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরি, কিন্তু ন্যায্যমূল্য পাই না। সরকার যে সহায়তা দেয়, তা দিয়ে শুধু চাল হয়, সংসারের বাকি খরচ চলে না।”

মানবাধিকার কর্মী মাধব দত্ত বলেন, শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে জেলে পরিবার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাদের নগদ অর্থ সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং নারী-শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা জরুরি। তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।

প্রতাপনগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রউফ জানান, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের অন্যতম বড় আতঙ্ক এখন জলদস্যু। ডাকাত চক্র জেলেদের অপহরণ করে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। এছাড়া স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করেও জেলেরা ন্যায্যমূল্য পান না।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম বলেন, জেলেদের জন্য শুধু চাল নয়, ডাল, তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও সরকারি পুকুর ইজারার মাধ্যমে জেলেদের স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। অনিবন্ধিত জেলেদেরও পর্যায়ক্রমে সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।