ইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা


অনলাইন ডেস্ক প্রকাশের সময় : মে ১৩, ২০২৬, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ
ইরান যুদ্ধে যেভাবে হুমকিতে পড়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব শুধু জ্বালানি বা বৈশ্বিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর ঢেউ এখন আঘাত হানছে সমুদ্রপথের পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেও। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে তিমির জীবনচক্রে তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি।

২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার কারণে প্রথম বড় ধরনের বাণিজ্যিক রুটে বিঘ্ন ঘটে। পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ বাধ্য হচ্ছে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ‘কেপ অব গুড হোপ’ রুট ব্যবহার করতে।

এই পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘পোর্টওয়াচ মনিটর’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই রুট ব্যবহার করেছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৪টি।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই সামুদ্রিক অঞ্চল ৪০টিরও বেশি প্রজাতির তিমির আবাসস্থল। বিশেষ করে ‘কেপ অব গুড হোপ’ এলাকা সাউদার্ন রাইট, হাম্পব্যাক এবং ব্রাইডস হোয়েলের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। পাশাপাশি ওড়কা, স্পার্ম হোয়েল, মিঙ্ক হোয়েল ও বিভিন্ন প্রজাতির ডলফিনও এখানে দেখা যায়।

গবেষকরা বলছেন, জাহাজ চলাচল বাড়ার কারণে তিমিদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও শব্দদূষণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এলস ভারমিউলেন জানান, অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ সরাসরি তিমির পালের মধ্য দিয়ে চলাচল করছে, যা প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিমিরা জাহাজের উপস্থিতি সবসময় বুঝতে পারে না, বিশেষ করে যখন তারা খাবার গ্রহণে ব্যস্ত থাকে। দ্রুতগতির জাহাজ চলাচল এই অঞ্চলে চারগুণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিমিদের অভ্যাসগত পরিবর্তনও তাদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক প্রজাতি এখন ব্যস্ত বাণিজ্যিক রুটের কাছাকাছি খাদ্য সংগ্রহ করছে, ফলে সংঘর্ষের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯৭টি তিমির মৃত্যুর মধ্যে অন্তত ১১টি সরাসরি জাহাজের ধাক্কায় হয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের রুট সামান্য পরিবর্তন, গতি কমানো এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা গেলে তিমির মৃত্যুর ঝুঁকি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। ইতোমধ্যে কিছু আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি পরিবেশ সংবেদনশীল এলাকায় রুট পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কেপ অব গুড হোপ অঞ্চলের তিমি সংরক্ষণে নতুন নীতিমালা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।