চাকরি সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

অপহরণ মামলায় আটক সুমন ধরা-ছোয়ার বাইরে মূলহোতা কামরুল


স্টাফ রিপোর্টার,কল্যান রায় জয়ন্ত প্রকাশের সময় : মে ১৩, ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ
অপহরণ মামলায় আটক সুমন ধরা-ছোয়ার বাইরে মূলহোতা কামরুল

যশোরে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের ঘটনায় তিনজন আটকের পর বেরিয়ে এসেছে কথিত একটি চাকরি প্রতারণা চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য। আটক ব্যক্তিদের একজন মারুফ হোসেন সুমনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা ও বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। তবে এ চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত কামরুল ইসলাম এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

গত ৬ মে যশোর শহরের বারান্দী মোল্লাপাড়ার লাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন, তফসিডাঙ্গা গ্রামের মৃত আবুল কালামের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন এবং নাজির শংকরপুর এলাকার মৃত মতিয়ার রহমানের ছেলে মারুফ হোসেন সুমনকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আটক সুমন জেলার একটি সংঘবদ্ধ চাকরি প্রতারণা সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। চক্রটির নেতৃত্ব দেন শহরতলীর নুরপুর গ্রামের মোদাচ্ছের হোসেনের ছেলে কামরুল ইসলাম। বিশেষ বাহিনী, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করাই ছিল তাদের মূল কর্মকাণ্ড।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, কামরুল ইসলাম কয়েক বছর আগেও ভ্যানে করে বেকারির রুটি-পাউরুটি বিক্রি করতেন। পরে বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য থাকার দাবি করে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার জাল বিস্তার করেন। সময়ের সঙ্গে গড়ে তোলেন শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট।

সূত্র জানায়, মারুফ হোসেন সুমন ছাড়াও মাগুরার মোহাম্মদপুর এলাকার আব্দুল জব্বার, মণিরামপুরের বুলি, নড়াইলের লিমনসহ অজ্ঞাত আরও ৭ থেকে ৮ জন সদস্য নিয়ে এই চক্র পরিচালনা করতেন কামরুল। কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকরিপ্রার্থীদের সংগ্রহ করে তার কাছে নেওয়া হতো। পরে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। টাকা নেওয়ার পর নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

কেশবপুরের পলাশ, নড়াইলের আমিনুর রহমান, কুষ্টিয়ার রুবেলসহ একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ও স্বজনদের কাছ থেকে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। এ ঘটনায় আগেও মামলা হয়েছে। গত বছরের ৫ এপ্রিল কেশবপুরের মজিদপুর এলাকার শ্যামল দাস চাকরির নামে ১৩ লাখ টাকা প্রতারণার অভিযোগে মণিরামপুর থানায় মামলা করেন। ওই মামলার তদন্তে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ১২ এপ্রিল কামরুল ইসলামকে আটক করেছিল।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কামরুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা চাকরি দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সংগ্রহ করতেন। পরে সেসব ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাত ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তদন্তে মনা ওরফে মনির, খসরু ও বসিরসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য মিলেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, একসময় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নুরপুর এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করেন কামরুল। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি ঝিনাইদহের বারোবাজার এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান নিয়ে দেশব্যাপী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। তার সঙ্গে সাবেক ও চাকরিচ্যুত কিছু সেনা কর্মকর্তার যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, কামরুল ও তার সহযোগীদের বাড়িতে অভিযান চালানো হলে বিপুল পরিমাণ ফাঁকা স্ট্যাম্প, চেকের পাতা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার হতে পারে। চাকরির পর অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এসব কাগজপত্র ব্যবহার করে মামলা ও হয়রানির শিকার করা হতো বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
চক্রটির মূলহোতাসহ জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রতারিতদের অর্থ ফেরত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।