বৈষম্য কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে আসন্ন জাতীয় বাজেটে ধনী ব্যক্তিদের ওপর নতুন করে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে প্রচলিত আয়করের ওপর সারচার্জ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী সরাসরি কর আরোপের চিন্তা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা ধনীদের ওপর কার্যকর কর আরোপে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ করের পরিমাণ নির্ভর করে ঘোষিত আয়ের ওপর, ফলে অনেকেই কম আয় দেখিয়ে কর ফাঁকির সুযোগ পাচ্ছেন। নতুন সম্পদ কর ব্যবস্থাকে তারা কর কাঠামোয় একটি বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে দেখছেন।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত মোট সম্পদ করমুক্ত থাকবে। এরপর পরবর্তী ২ কোটি টাকার ওপর ০.২৫ শতাংশ, পরের ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৫০ শতাংশ, আরও ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৭৫ শতাংশ এবং বাকি সম্পদের ওপর ১ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। সম্পদের মূল্য নির্ধারণে জমির ক্ষেত্রে মৌজা দর, ভবনের ক্ষেত্রে গণপূর্ত বিভাগের মূল্য, সোনার বাজারদর এবং শেয়ারের ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্য বা নিট সম্পদমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটিকে বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে ৩০ হাজার ৮০৪ জন করদাতা মোট ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার সম্পদ ঘোষণা করেছেন। বিপরীতে সারচার্জ আদায় হয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট সম্পদের মাত্র ০.২৯ শতাংশ।
কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় উচ্চ সম্পদশ্রেণিতে কার্যকর করহার কমে যাওয়ায় কর ব্যবস্থার প্রগতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষেত্রে কার্যকর সারচার্জ হার প্রায় ০.৪৩ শতাংশ, যা ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের ওপর আরোপিত ০.৫৪ শতাংশের চেয়েও কম।
এছাড়া একটি ক্ষুদ্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ঘোষিত সম্পদের প্রকৃত মূল্য প্রায় ৮৯ শতাংশ বেশি হতে পারে। এতে বর্তমানের তুলনায় রাজস্ব আদায় ৩৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে একটি পৃথক সম্পদ কর আইন প্রণয়ন, স্বয়ংক্রিয় ই-রিটার্নভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, স্থায়ী মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং দ্বিস্তরীয় বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সম্পদের পরিমাণ কম দেখানো, পুঁজি পাচার এবং দুর্বল তথ্যভাণ্ডারের কারণে বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। এজন্য শক্তিশালী ডিজিটাল কর প্রশাসন, নির্ভরযোগ্য সম্পদ ডেটাবেস এবং কঠোর নজরদারির ওপর জোর দিয়েছেন তারা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সম্পদ কর চালু রয়েছে। নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডে এখনো এ ধরনের কর কার্যকর থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবের অভিযোগে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো কয়েকটি দেশ এ ব্যবস্থা বাতিল করেছে।
আপনার মতামত লিখুন :