
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এবং দামও দ্রুত বাড়ছে।
বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদিও অপরিশোধিত তেলের মজুত এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তবে পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি দ্রুত প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে জেট ফুয়েল ও ন্যাফথার মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিশোধিত জ্বালানির বাণিজ্যিক মজুত মাত্র ৪৫ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো অবস্থায় রয়েছে, যা সংকট শুরুর আগে ছিল প্রায় ৫০ দিনের সমান। বিপরীতে অপরিশোধিত তেলের মজুত এখনো প্রায় ১০১ দিনের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা রাখছে। ফলে মূল সংকটটি তৈরি হয়েছে পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নে।
ন্যাফথার মজুত কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে ফেব্রুয়ারি থেকে এর মজুত ৭২ শতাংশ কমেছে এবং ইউরোপের বিভিন্ন হাবে কমেছে ৩৭ শতাংশ। চীন বাদে এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও ইউরোপের কিছু অঞ্চলে এই সংকট সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে রপ্তানি বিধিনিষেধ, বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রিফাইনিং সীমাবদ্ধতার কারণে এক অঞ্চলের উদ্বৃত্ত তেল অন্য অঞ্চলের ঘাটতি মেটাতে পারছে না। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিমান চলাচল খাতে। জেট ফুয়েলের ঘাটতির কারণে বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ফ্লাইট কমাতে বা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জুনের মধ্যে ইউরোপে জেট ফুয়েলের মজুত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিচে নেমে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। এর জেরে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, যা বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ১১৩ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রায় ১০৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবুও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :