ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে পুনরায় আলোচনা শুরু হলেও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। সামরিক তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকলেও যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক নৌপথ, জ্বালানি বাজার এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা, লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে। এর ফলে দেশটির তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে তারা ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত তেল বিক্রি করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া একটি সমঝোতার আওতায় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রির প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, এসব আয় দেশটির বার্ষিক তেল রাজস্ব লক্ষ্যের প্রায় ৬০ শতাংশের সমান। তবে দীর্ঘস্থায়ী নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে তেল রপ্তানি কমে যেতে পারে এবং দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ অমান্য করে চলাচলের চেষ্টা করা বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজকে গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজে তল্লাশিও চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত একটি তেলবাহী জাহাজে অভিযান চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান থেকে তারা সরে আসেনি। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কোনো চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না। একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই নতুন হামলা থেকে বিরত রয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব ইরানের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থায়ও পড়েছে। দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন ২ কোটি লিটারের বেশি পেট্রোল ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকট, লোডশেডিং এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
ইরান সরকার জানিয়েছে, হামলায় দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের আগে দৈনিক প্রায় ৬৫ কোটি ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদন হলেও হামলার কারণে এর একটি বড় অংশ ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরেও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। এর ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজ পরিবহন ও বীমা খরচও বেড়েছে।
অন্যদিকে কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। ইরানের দাবি, হামলায় একজন নাবিক নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অবশ্য দাবি করেছেন, জাহাজটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন শুধু একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইরানের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।