উৎপাদন বাড়লেও সংকটে দেশের চা-শিল্প

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে- সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ব্রিটিশ আমল থেকে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা চা-শিল্প বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। সময়ের সঙ্গে চা উৎপাদন বাড়লেও বাড়েনি কাঙ্ক্ষিত মুনাফা। বরং জ্বালানি, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, পরিবহন ব্যয় এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাপের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ১০ কোটি ২ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। ২০২৪ সালে উৎপাদন কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজিতে। তবে ২০২৫ সালে আবার বেড়ে উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি। চলতি ২০২৬ সালে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যয়। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। অথচ নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। ফলে প্রতি কেজি চায়ে লোকসান হয়েছে ৫১ টাকা ১২ পয়সা। সংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক দশকে চা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সময়ে ২০০২ সালের তুলনায় চা রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। ফলে উৎপাদন বাড়লেও লাভজনক অবস্থানে ফিরতে পারছে না অনেক চা-বাগান।

চা-বাগান মালিকদের অভিযোগ, চা-শিল্পকে কৃষিখাতের পরিবর্তে শিল্পখাত হিসেবে বিবেচনা করায় উচ্চ সুদের ঋণের চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক বাগান পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় নতুন ঋণ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তাদের মজুরি এখনো পর্যাপ্ত নয়। চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশ বাগানের আর্থিক পরিস্থিতি ভালো নয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাগান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে উন্নতমানের চা উৎপাদন করতে পারলে নিলামে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজড়া বলেন, বর্তমানে চা উৎপাদনের অবস্থা আগের তুলনায় ভালো। উৎপাদন বাড়ছে, তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। চা-শিল্পের সংকট মোকাবিলায় সরকারি টাস্কফোর্স আটটি অগ্রাধিকার খাতে ৫৯টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চা-বাগানকে কৃষিখাত হিসেবে পুনঃশ্রেণিবিন্যাস, ৬ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান, ঋণ পুনর্গঠন, ভ্যাট কমানো, চা পুনরোপণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

এ ছাড়া চা-শিল্পের উন্নয়নে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় চা পুনঃরোপণ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জাতীয় চা ব্র্যান্ড তৈরি, জিআই স্বীকৃতি অর্জন এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও পানিসংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই চা-শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে। টাস্কফোর্সের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে দেশের চা-শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।