ত্রিশালের হারবা বিলে হাওরের স্বাদ, বিল-নদীতে দীর্ঘ নৌভ্রমণের হাতছানি

ত্রিশাল প্রতিনিধি, এম.এ.এইচ রাকিবুল ইসলাম  প্রকাশিত হয়েছে- শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

বর্ষা এলেই ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার হারবা বিল যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। দিগন্তজোড়া জলরাশি, পানির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছ, নৌকার মৃদু ছন্দ, জলবেষ্টিত মসজিদ এবং গোধূলির রঙিন আকাশ—সব মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য হারবা বিল হয়ে ওঠে এক মোহময় ভ্রমণকেন্দ্র। অল্প সময়ের জন্য হলেও এখানে এলে হাওরাঞ্চলের মতো বিস্তীর্ণ জলরাশির স্বাদ ও আবহ অনুভব করা যায়।

ত্রিশাল উপজেলার সাইনবোর্ড বাজার থেকে কাশিগঞ্জ বাজারের সড়কে, কাশিগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে হারবা বিলের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে পুরো বিল পানিতে ভরে গেলে চারপাশে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ। এই বিলের জলরাশি গিয়ে মিলেছে খিরু নদীতে। ফলে দর্শনার্থীরা চাইলে একই নৌভ্রমণে হারবা বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি পেরিয়ে খিরু নদীর শান্ত প্রবাহেও ঘুরে বেড়াতে পারেন। বিল থেকে নদীতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতির রূপ, যা দীর্ঘ নৌভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

হারবা বিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি হলো বিলের মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা একটি হিজল গাছ। বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে গাছটি যেন পুরো বিলের সৌন্দর্যের প্রতীক। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা ছোট নৌকায় করে গাছটির কাছে গিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেন। অনেকের কাছেই এই হিজল গাছকে ঘিরেই হারবা বিল ভ্রমণের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি হয়।

নৌভ্রমণই হারবা বিলের প্রধান আকর্ষণ। অল্প ভাড়ায় ছোট ছোট নৌকা পাওয়া যায়, যা নিয়ে দর্শনার্থীরা বিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে পারেন। বৈঠার ছন্দে এগিয়ে চলা নৌকা, চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, নির্মল বাতাস এবং খোলা আকাশ মিলিয়ে সৃষ্টি হয় হাওরের মতো শান্ত ও মনোরম পরিবেশ। খিরু নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে নৌভ্রমণের সুযোগও মিলছে এখানে।

প্রকৃতির পাশাপাশি বিলের মাঝখানে অবস্থিত জলবেষ্টিত মসজিদও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। চারদিকে পানি আর সবুজের মাঝে মসজিদের গম্বুজ ও মিনার পুরো দৃশ্যকে আরও নান্দনিক করে তুলেছে। অন্যদিকে বিলের এক পাশে থাকা ইটভাটার সারি প্রকৃতির সঙ্গে ভিন্নধর্মী এক বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করেছে।

বিকেলের দিকে হারবা বিলের সৌন্দর্য আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করলে সোনালি-লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে শান্ত জলরাশির ওপর। পানিতে সূর্যের প্রতিফলন, দূরের গাছপালা আর নৌকার চলাচল মিলিয়ে সৃষ্টি হয় অপূর্ব এক দৃশ্য। বিল থেকে খিরু নদীর দিকে নৌকায় ভেসে সূর্যাস্ত উপভোগ করা ভ্রমণকারীদের জন্য হয়ে ওঠে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষাকালে হারবা বিলের সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। বিশেষ করে বিস্তীর্ণ জলরাশি, বিল-নদীর সংযোগ, দীর্ঘ নৌভ্রমণ এবং বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল গাছ পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হারবা বিলের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় এর জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশৃঙ্খল নৌভ্রমণ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে হারবা বিল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বর্ষার অপরূপ সৌন্দর্য, হাওরের আবহ, বিল থেকে খিরু নদীতে দীর্ঘ নৌভ্রমণের সুযোগ, হিজল গাছের নৈসর্গিক দৃশ্য, জলবেষ্টিত মসজিদ, বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত—সব মিলিয়ে ত্রিশালের হারবা বিল প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।