লিবিয়ায় জিম্মি ৬ বাংলাদেশি তরুণ, পরিবারকে ভিডিও কলে রেখে নির্যাতন

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে- বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ভালো জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় তরুণ। কিন্তু অবৈধ পথে লিবিয়ায় যাওয়ার পর তাদের সেই স্বপ্ন এখন ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রায় আট মাস ধরে মানব পাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি রয়েছেন তারা। মুক্তিপণের টাকা আদায়ে তাদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন।

জানা গেছে, নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে জনপ্রতি ২৭ লাখ টাকা করে দাবি করছে পাচারকারী চক্র। ছয় তরুণের মুক্তির জন্য মোট ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে।

জিম্মি থাকা তরুণরা হলেন— মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে শাহাদাত হোসেন (২০), মাহবুবুর রহমানের ছেলে মানিকুল ইসলাম (২০), হারুনুর রশিদের ছেলে মো. সোহেল (২৭), ছবু মিয়ার ছেলে তাজ মোহাম্মদ (২৫), সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে ফয়সাল (২০) এবং লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে মেহেদী হাসান (২১)।

শাহাদাত হোসেন খিলা ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হারুনুর রশিদের ভাগনে এবং মেহেদী হাসান তার শ্যালক। হারুনুর রশিদ জানান, প্রতিদিনই ওই ছয় তরুণকে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। সেই দৃশ্য ভিডিও করে পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। টাকা না দিলে তাদের হত্যা করে মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রায় এক সপ্তাহ আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপের তথ্য তারা পাননি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে আট থেকে নয় মাস আগে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা দেশ ছাড়েন। চুক্তি অনুযায়ী লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে তাদের ইতালি পাঠানোর কথা ছিল। এজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু পরে তাদের একটি মানব পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, লিবিয়ার বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখার পর সম্প্রতি তাদের অন্য একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য প্রতিদিন নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠানো হচ্ছে। হারুনুর রশিদ বলেন, ছয় পরিবারের কারোরই নতুন করে এত বিপুল অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বিদেশে পাঠানোর জন্য আগে থেকেই ঋণ, ধারদেনা ও জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। এখন তারা চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করেন, ইতালি পাঠানোর কথা বলে গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিক ও তার ভাই সামছুল আলম প্রায় ২০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেকে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মেহেদী হাসানের বাবা শাহ আলম জানান, ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে প্রায় ১৮ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। এখন মুক্তিপণের দাবিতে ছেলেকে নির্যাতনের দৃশ্য দেখে পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে।

এদিকে নির্যাতনের ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত দালালদের পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ জানান, বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।