পঞ্চগড়ে অবৈধ ব্যাটারি কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে গবাদিপশুর মৃত্যু

তেতুলিয়া উপজেলা প্রতিনিধি, রাকিব হাসান প্রকাশিত হয়েছে- বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত একটি ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে গবাদিপশুর মৃত্যু, কৃষিজমি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কারখানা থেকে নির্গত অ্যাসিড, সিসা ও বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য আশপাশের জমি ও পানিতে মিশে দূষণের সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের পর থেকে কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপক আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ঘটনার পর রাতারাতি কারখানার যন্ত্রপাতি ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগড় ইউনিয়নের দেবুপাড়া গ্রামে কয়েক মাস ধরে খোলা জায়গায় পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার কাজ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাটির কোনো বৈধ পরিবেশগত অনুমোদন না থাকলেও সেখানে ব্যাটারির অ্যাসিড, সিসা ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে আশপাশের কৃষিজমি, জলাশয় ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, কারখানা থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত পানি ও দূষিত ঘাস খেয়ে তাদের ছয়টি গরু মারা গেছে। আরও দুটি গরু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এতে কয়েকজন কৃষকের কয়েক লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি পুকুরের মাছ মারা যাওয়া, গাছপালা শুকিয়ে যাওয়া এবং জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে গবাদিপশুর পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, মাছ, ফসল ও জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তারা দ্রুত কারখানা বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি সুমন রেজাসহ কয়েকজন যুক্ত ছিলেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সুমন রেজা বলেন, কারখানাটির সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।

জমির মালিক জানান, সেখানে কী ধরনের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে, তা তিনি আগে জানতেন না। তার অভিযোগ, তার ভাতিজা সুমন কারখানাটি সেখানে স্থাপন করেছেন। তিনি বাধা দিলেও বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি কারখানার বর্জ্যের কারণে তার পুকুরের মাছও মারা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

কারখানার শ্রমিকরা মালিক ও ব্যবস্থাপকের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে রাজি না হলেও তারা স্বীকার করেন, বৃষ্টির পানির সঙ্গে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপক ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। তবে মুঠোফোনে ভাই ভাই ব্যাটারি কারখানার মালিক আইনুল হক ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এবং কারখানাটি সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

দেবনগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে এবং দ্রুত কারখানাটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা জানান, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত এ ধরনের অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য শুধু গবাদিপশুর মৃত্যুর কারণ নয়, এটি কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। তাই দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।