বেনাপোল-নড়াইল রুটে নিত্যনতুন কৌশলে স্বর্ণ পাচার

স্টাফ রিপোর্টার, কল্যান রায় জয়ন্ত প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

ঢাকা থেকে যশোর, এরপর বেনাপোল সীমান্ত হয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচারের পুরোনো রুটটি আবারও সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। সম্প্রতি যশোর-নড়াইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বারসহ কয়েকজন পাচারকারীকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে পাচারের উদ্দ্যেশ্যে এসব স্বর্ণ আটকের পর সীমান্তজুড়ে সক্রিয় স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের নতুন কৌশল নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বড় বড় চোরাকারবারীরা এখন আর নিজেরা স্বর্ণ বহন করেন না। সাধারণ যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা আর্থিক সংকটে থাকা ব্যক্তিদের ‘কুরিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধরা পড়ছেন মূলত এসব বাহক; কিন্তু পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারীরা থেকে যাচ্ছেন আড়ালে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত কিংবা বিদেশ থেকে আসা স্বর্ণ প্রথমে ঢাকায় জড়ো করা হয়। এরপর বাস, প্রাইভেটকার বা অন্যান্য পরিবহনে বিশেষ কায়দায় যশোরে আনা হয়। সেখান থেকে সুবিধাজনক সময়ে বেনাপোল সীমান্ত ঘেঁষা বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতে পাচারের চেষ্টা করা হয়।

যশোরের দাইতলা-ফতেপুর ও নীলগঞ্জ ব্রিজ এলাকায় সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়া বেশ কয়েকটি স্বর্ণের চালানও একই রুটে নেওয়া হচ্ছিল বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে। চোরাচালানকারীরা এখন একেক চালানে একেক বাহক ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে বাহক জানতেই পারেন না, তিনি যে প্যাকেট বহন করছেন, তাতে কী রয়েছে। আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বর্ণ বহন করেন। সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই কয়েক দফায় বাহক পরিবর্তন করা হয়। ফলে চক্রের কোনো একজন সদস্য ধরা পড়লেও পুরো চক্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল হয়। এই ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে চোরাচালানকারীরা বৈধ চলাচলের আড়ালে অবৈধ চালান সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ ছাড়া সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা, অসংখ্য সংযোগ সড়ক এবং স্থানীয় দালালচক্রের সক্রিয়তাও এই রুটকে চোরাকারবারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা কেবল বাহক। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা করা হলেও প্রমাণের অভাবে অনেক সময় তদন্ত এগোয় না। চোরাচালান চক্রগুলো সাধারণত স্তরভিত্তিকভাবে পরিচালিত হয়। একজন কেবল সংগ্রহ করেন, আরেকজন পরিবহন নিশ্চিত করেন, অন্যজন সীমান্ত পার করার দায়িত্বে থাকেন। ফলে পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণের অবৈধ পাচার শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, কর আদায় এবং বৈধ স্বর্ণ ব্যবসার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অবৈধ পথে স্বর্ণ পাচারের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব হারায়, একই সঙ্গে বৈধ আমদানি ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু বাহক গ্রেফতার করেই এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে অর্থদাতা, সংগঠক, সীমান্ত সমন্বয়কারী এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্তঃসংস্থার তথ্য আদান-প্রদান এবং আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক যশোর-নড়াইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্বর্ণের চালান আটকের ঘটনা স্পষ্ট করেছে চালান ধরা পড়লেও চোরাচালানের নেপথ্যের বড় নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি অক্ষত। ফলে পাচারের রুট ও কৌশল বদলালেও অপরাধচক্রের মূল কাঠামো বহাল রয়েছে। তাদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে এ ধরনের চোরাচালান বন্ধ করা কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।