কক্সবাজারে বন্যার পানি কমলেও কাটেনি দুর্ভোগ

চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি: প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ভয়াবহ বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অধিকাংশ পরিবার বাড়ি ফিরলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে নানা সংকট। কাদামাটিতে ভরে গেছে ঘরবাড়ি, নষ্ট হয়েছে খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি জিনিসপত্র। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। পাশাপাশি অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌঁছায় হতাশা বাড়ছে বানভাসি মানুষের মধ্যে।

পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। একটি পৌরসভাসহ দুই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ এ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নদীর তীর ভাঙন, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

শুক্রবার সকাল থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করলে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষজন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। তবে ঘরে ফিরে তারা দেখতে পান বসতঘর কাদায় ভরা। রান্নার সামগ্রী, আসবাবপত্র ও মজুত করা খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পরিবার বাড়িতে ফিরেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু করতে পারছে না।

চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, হারবাং, কৈয়ারবিল, লক্ষ্যারচর, কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, বমুবিলছড়ি, ফাঁসিয়াখালী, চিরিংগা, চকরিয়া পৌরসভা, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়ন এবং মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, পশ্চিম বড়ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া ও বদরখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও এখনো হাঁটুসমান পানি জমে আছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার সময় প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ সহায়তা কম ছিল। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট ছিল তীব্র। ঢেমুশিয়া উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ছিদ্দিক আহমদ বলেন, “ত্রাণের পরিমাণ খুবই সীমিত ছিল। অনেকেই নিয়মিত খাবার পাননি। বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।”

স্থানীয়রা জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এখন প্রায় খালি হয়ে গেছে। মানুষ বাড়ি ফিরলেও অনেক ঘরে এখনো রান্নার চুলা জ্বলেনি। শুকনো খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন। ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এ দুর্যোগে পাহাড়ধসে দুইজন এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে একজনসহ মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, বর্তমানে সব আশ্রয়কেন্দ্র খালি হয়ে গেছে। তবে অধিকাংশ পরিবার এখনো খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে। ডেইঙ্গাকাটা, পাহাড়চান্দা, শান্তিবাজার, বিবিরখিল হিন্দুপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় এখনো পানি জমে আছে। তিনি দ্রুত ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান।

এদিকে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বাঁধ সংস্কার না করা হলে ভবিষ্যতে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, “সরকারি সহায়তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিতরণ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।”

অন্যদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। তিনি দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন।

বন্যার পানি কমলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংকট এখনো কাটেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে বন্যা-পরবর্তী দুর্ভোগ আরও প্রকট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।