নেছারাবাদে ফুলঝাড়ু শিল্প, স্বাবলম্বী হাজারো পরিবার

ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি : প্রকাশিত হয়েছে- শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠা ফুলঝাড়ু শিল্প এখন শত শত মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বনে পরিণত হয়েছে। অল্প পুঁজি, সহজ প্রযুক্তি ও স্থানীয় শ্রমনির্ভর এই কুটিরশিল্পে কাজ করে নারী-পুরুষ উভয়েই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ফলে অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা।

আধুনিক গৃহস্থালির নানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম বাজারে এলেও ফুলঝাড়ুর চাহিদা কমেনি। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই এর ব্যবহার থাকায় উৎপাদিত ঝাড়ু বিক্রি নিয়ে উদ্যোক্তাদের তেমন কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

ফুলঝাড়ু তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো উলুফুল বা ঝাড়ুফুল। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ফুল উৎপাদিত হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মূলত বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উলুফুল সংগ্রহ করে শুকিয়ে সারা বছর ঝাড়ু তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার মাগুরা, অলংকারকাঠী, পানাউল্লাহপুর, কুনিয়ারী, সংগীতকাঠী, সুটিয়াকাঠি, নান্দুহার ও জনতা বাজার এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় ফুলঝাড়ু কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় সরাসরি কাজ করছেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক।

কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের ব্যস্ত সময় কাটছে ঝাড়ুর শলা ছাঁটা, হাতল লাগানো, স্কচটেপ বা পিভিসি পাইপ সংযুক্ত করা এবং বাজারজাতের উপযোগী করে তোলার কাজে। পুরুষ শ্রমিকেরা উলুফুল ও পাটখড়ি দিয়ে ঝাড়ুর মূল কাঠামো তৈরি করেন, আর নারী শ্রমিকেরা শেষ ধাপের কাজ সম্পন্ন করেন। কুনিয়ারী গ্রামের শ্রমিক মো. নাসির জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি ঝাড়ু তৈরি করে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন। এই আয়েই পরিবারের ভরণপোষণ করছেন।

আরেক শ্রমিক মজিবর শেখ বলেন, “আমরা মালিকের কাঁচামাল দিয়ে ঝাড়ু তৈরি করি। প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৬ টাকা মজুরি পাই। এতে আগের তুলনায় সংসারের অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে।” নারী শ্রমিক খাদিজা বেগম বলেন, “আগে শুধু স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এখন কারখানায় কাজ করে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টাকা আয় করি। এতে সংসারের খরচ সামলাতে অনেক সুবিধা হচ্ছে।”

ঝাড়ু কারখানার মালিক মো. কবির হোসেন জানান, একজন দক্ষ শ্রমিক কয়েক মিনিটেই একটি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। শ্রমিকেরা প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৫ টাকা মজুরি পান। পাইকারি বাজারে একটি ঝাড়ু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এর দাম ১০০ টাকারও বেশি। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামাল সংগ্রহ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, উলুফুল সংগ্রহে নানা জটিলতার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে পিরোজপুর বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, “ফুলঝাড়ু শিল্পে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী কেউ ঋণ বা অন্য কোনো সহায়তা চাইলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।” স্থানীয়দের মতে, প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা মিললে নেছারাবাদের এই সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্প আরও বিকশিত হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি শত শত পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আরও উন্নয়ন ঘটবে।