ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৮ দিন বয়সী নবজাতক সন্তানসহ এক মায়ের অলৌকিক উদ্ধারের ঘটনা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সন্তানকে বুকে আগলে রাখা ওই মা জানিয়েছেন, ছোট্ট শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাসই তাকে অন্ধকার গর্তের মধ্যে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছে।
দায়ানা পাতিনো নামের ওই নারী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার সময় তার একমাত্র ভরসা ছিল ছেলে হুয়ান ডেভিড। তিনি বলেন, “যতক্ষণ ও বেঁচে ছিল, আমিও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ও যে তখনও শ্বাস নিচ্ছে, তা নিশ্চিত হতে আমি বারবার ওর ছোট্ট নাকে হাত দিয়ে দেখতাম।”
গত বুধবার ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়। দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন ৩ হাজার ১৫০ জনের বেশি মানুষ। এখনও প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট এ ঘটনাকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ভূমিকম্পের সময় দায়ানা উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরায় নিজেদের আটতলা অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে থালাবাসন ধুচ্ছিলেন। প্রথমে তিনি এটিকে সাধারণ কম্পন মনে করেছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
দায়ানা বলেন, “হঠাৎ মনে হলো আমি বাতাসে উড়ে যাচ্ছি। এরপর পানি ও কাদামাটির নিচে তলিয়ে গেলাম। গভীর অন্ধকার এক গর্তে পড়ে গেলাম। ধসে পড়া আসবাবপত্রের নিচে পুরোপুরি চাপা পড়ে গিয়েছিলাম।” ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার পরও তিনি চিৎকার করে শক্তি নষ্ট না করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তিনি জানতেন, সাহায্যের শব্দ পেলেই তাকে নিজের সব শক্তি ব্যবহার করতে হবে। তার বাম পা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়েছিল এবং তিনি নড়াচড়াও করতে পারছিলেন না।
একপর্যায়ে তিনি পিঠের নিচে একটি বাইবেল অনুভব করেন। সেটিই তাকে নতুন করে আশাবাদী করে তোলে। ওপরের দিকে ছোট্ট একটি আলোর রেখাও দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পান দায়ানা। তখন শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলেন, “আমি এখানে।” পরে তার ভাই জানান, তাকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে সরবেন না।
অবশেষে বৃহস্পতিবার রাতে জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে দায়ানা ও তার সন্তানকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। দায়ানার দুই পায়ে আঘাত লাগলেও নবজাতক হুয়ান ডেভিড প্রায় অক্ষত ছিল। দায়ানার স্বামী গারসন ভূমিকম্পের সময় বাড়ির বাইরে ছিলেন। চোখের সামনে অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে পড়তে দেখে তিনি স্ত্রী ও সন্তানের বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। পরে তাদের জীবিত ফিরে পাওয়াকে তিনি “অলৌকিক ঘটনা” হিসেবে বর্ণনা করেন।
উদ্ধারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা মানুষের আবেগ ছুঁয়ে যায়। সেখানে দেখা যায়, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন গারসন। গারসন বলেন, “আমি ধরে নিয়েছিলাম তারা আর বেঁচে নেই। কিন্তু যখন ছেলেকে অক্ষত দেখলাম, মনে হলো আমি নিজেই নতুন জীবন পেয়েছি।” ভূমিকম্পে তাদের ঘরবাড়ি, সম্পদ সব হারিয়ে গেলেও দায়ানা ও গারসনের বিশ্বাস—বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। তারা এখন শূন্য থেকে নতুন জীবন শুরু করার প্রত্যয় জানিয়েছেন।