সরকার ঘোষিত দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উৎপন্ন কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করতে পারে বলে এক সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষা জোরদার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৃহৎ পরিসরে বনায়নের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনের সম্ভাবনা।
জলবায়ু অর্থায়ন বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ বৃদ্ধি এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেতে পারে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়, কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে আয় করতে সক্ষম হবে।
কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্যের জন্য নির্ধারিত রোপণ এলাকা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অংশগ্রহণকারী দেশের কাছে নিবন্ধন, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করতে হয়। শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন ও যাচাই (এমআরভি) ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ক্রেডিটের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এই উদ্যোগ পরিবেশগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানো, বৃষ্টিপাতের ভারসাম্য উন্নয়ন, মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি এবং বাস্তুতন্ত্রের সহনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কার্বন বাজার বর্তমানে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে কার্বন মূল্য নির্ধারণ বাজার থেকে আয় প্রায় ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমান বাজার সক্ষমতা প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে অংশ নিতে প্রস্তুত নয়। আর্টিকেল ৬ ব্যবস্থাপনা, কার্বন ক্রেডিট ইস্যু ও বাণিজ্যের জন্য আইনগত কাঠামো, এবং এমআরভি ও প্রকল্প সনদায়নে সরকারি-বেসরকারি খাতের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
এই ঘাটতি পূরণে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কার্বন ক্রেডিট হলো এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, অপসারণ বা প্রতিরোধের যাচাইকৃত একক। সাধারণত বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা ও মিথেন নিয়ন্ত্রণের মতো কার্যক্রম থেকে এসব ক্রেডিট তৈরি হয়।
বাংলাদেশ এর আগে কার্বন বাজারে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ২০০৬ সালে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (আইডিসিওএল) জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সংস্থায় দেশের প্রথম ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (সিডিএম) প্রকল্প নিবন্ধন করে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি ২.৫৩ মিলিয়ন কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে ১৬.২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।
সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি একদিকে যেমন জলবায়ু মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।