টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কোথাও নদীভাঙন, কোথাও জলাবদ্ধতা এবং কোথাও পাহাড়ধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সুনামগঞ্জ, গাইবান্ধা ও কক্সবাজারের টেকনাফে।
সুনামগঞ্জে বাড়ছে হাওর ও নদীর পানি
উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে গত রোববারের তুলনায় ঢলের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক থেকেও পানি নেমে গেছে।
সোমবার (২২ জুন) পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানির উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ১৮ মিটার, যা বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার নিচে। তবে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পানি আবারও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদী ও হাওরের পানি আরও বাড়তে পারে। তবে আপাতত বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
এদিকে তাহিরপুর উপজেলার বড়দল পুরানহাটি এলাকায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে খালের পাড় ভেঙে ঘর ধসে রুবেল মিয়া (৩০) নামে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সাত ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান শেষে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিস্তার ভাঙনে বিলীন শতাধিক বসতভিটা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত এক সপ্তাহে দেড় শতাধিক বসতভিটা এবং চার শতাধিক একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চর এলাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন রোধে ফেলা জিও ব্যাগ ও জিও টিউব তিস্তার প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ফলে নদীভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। ভাঙনের মুখে থাকা পরিবারগুলো নিরাপদ স্থানে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক কাজ চললেও নদী খনন ও নদীশাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম।
টেকনাফে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, বাড়ছে পাহাড়ধসের শঙ্কা
কক্সবাজারের টেকনাফে গত দুই-তিন দিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করছে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, হ্নীলা, সদর ইউনিয়ন, বাহারছড়া, হোয়াইক্যং ও শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলি জমি ও চিংড়ি ঘের।
এ ছাড়া উত্তাল সাগরে শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণপাড়া এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে গেছে। যদিও ট্রলারের মাঝিমাল্লারা সাঁতরে নিরাপদে তীরে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ও জালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
টেকনাফ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ আহমেদ বলেন, টানা বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উজানে বৃষ্টিপাত এবং মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। যদিও বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই, তবে স্থানীয়ভাবে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।