রামিসা ধর্ষণ-হত্যা রায়ের পর্যালোচনায় যা বললেন আদালত

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে- রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দুই আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এই অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক কঠিন পরীক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যখন এমন জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকে নাড়া দেয়।

আদালত পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৮০০-র বেশি শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেই বিবেচনায় রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান। আদালত দ্রুত ও মানসম্মত তদন্তের জন্য তদন্তকারী সংস্থা এবং অল্প সময়ে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার জন্য প্রসিকিউশনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিচারক আশা প্রকাশ করেন, এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতনের অন্যান্য মামলার জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

গত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ২ জুন মাত্র একদিনে ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। পরে ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকালে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার বাসা থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের বাসায় নিয়ে যান। পরে শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে তার বাবা-মা সোহেল রানার কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান। কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করলে তারা মস্তকবিহীন মরদেহ দেখতে পান। পরে একটি বালতির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা।

ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ২০ মে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন রামিসার বাবা। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।