মাটির গন্ধে প্রেম

বুলবুল হোসেন: প্রকাশিত হয়েছে- মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
মাটির গন্ধে প্রেম
মোঃ বুলবুল হোসেন
ফায়াজ শেষবার গ্রামের বাড়িতে ঈদ করেছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। তারপর শহরের পড়াশোনা, কোচিং, চাকরির প্রস্তুতি সব মিলিয়ে ঈদ মানেই হয়ে উঠেছিল ঢাকার ব্যস্ত ছাদের নিচে সীমাবদ্ধ কিছু নামাজ আর আত্মীয়দের ফোনকল। কিন্তু এবারের কোরবানি ঈদে হঠাৎ করেই তার বুকের ভেতর কেমন এক টান অনুভব হলো।
যেন কেউ দূর থেকে ডাকছে ফিরে আয়। তার দাদু বহুদিন ধরেই বলছিলেন, মরার আগে আরেকবার তোকে নিয়ে গরুর হাটে যেতে চাই রে। সেই কথাটাই হয়তো মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। শহরের ধুলোভরা সকাল ছেড়ে যখন বাসটা গ্রামের দিকে ছুটছিল, ফায়াজ জানালার পাশে বসে দূরের সবুজ মাঠ দেখতে লাগল। আকাশে সাদা মেঘ, মাঝেমধ্যে কাঁচা রাস্তা, নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো—সবকিছুই যেন বহুদিনের পুরোনো কোনো স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলছিল।
বাস থেকে নামতেই গ্রামের বাতাস তাকে অন্যরকম এক শান্তি দিল। স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েই সে গভীর শ্বাস নিল। মাটির গন্ধ। কাঁচা ঘাসের গন্ধ। দূরে কারো বাড়ি থেকে ভেসে আসছে গরুর ঘণ্টার শব্দ। দাদু তাকে নিতে এসেছেন ভ্যানগাড়ি নিয়ে। এই শহুরে ছেলেটারে চিনতেই পারতেছি না! দাদু হেসে বললেন। ফায়াজ ব্যাগ রেখে দাদুকে জড়িয়ে ধরল। কতদিন পরে এই স্পর্শ! ভ্যানগাড়ি গ্রামের রাস্তা ধরে এগোতে লাগল। দুপাশে ধানক্ষেত, কচি বাতাস।
ফায়াজের মনে হচ্ছিল, জীবনের আসল শান্তি বুঝি এখানেই লুকিয়ে আছে। বাড়িতে পৌঁছাতেই দাদি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আমার নাতিটা কত শুকায়া গেছে! সারাদিন আত্মীয়স্বজনদের ভিড় লেগেই রইল। সন্ধ্যার দিকে একটু ফাঁকা পেয়ে ফায়াজ বাড়ির পুকুরপাড়ে গেল। জায়গাটা এখনও আগের মতোই আছে। বড় আমগাছ, বাঁশঝাড়, আর পানিতে ভাসা শাপলা। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো মেয়েলি কণ্ঠ আপনি কি ফায়াজ ভাই? ফায়াজ ঘুরে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। নীল সালোয়ার কামিজ পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় চোখ। মুখে শান্ত হাসি। বাতাসে উড়ছে কপালের চুল। ফায়াজ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, জি… কিন্তু আপনি?
মেয়েটা মুচকি হাসল। আমি মেহরিন। পাশের বাড়ির চাচার মেয়ে। ফায়াজ হঠাৎ মনে করার চেষ্টা করল। ছোটবেলায় হয়তো দেখেছিল। কিন্তু তখন সে ছিল ছোট্ট একটা মেয়ে। ওহ… তুমি! আপনি তো একদম বদলে গেছেন। তুমিও। এই ছোট্ট কথাটুকু বলেই ফায়াজ কেমন যেন লজ্জা পেল। সেদিন সন্ধ্যার আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে ছিল। পুকুরের পানিতে সেই আলো পড়ে চিকচিক করছিল। আর সেই আলোর মাঝেই প্রথমবারের মতো মেহরিনকে অন্যরকম সুন্দর লাগল তার।
পরদিন সকালে দাদু ফায়াজকে নিয়ে গরুর হাটে গেলেন।গ্রামের কোরবানির হাট শহরের মতো নয়। এখানে হৈচৈ আছে, কিন্তু তাতে একধরনের আন্তরিকতা মিশে থাকে। সবাই সবাইকে চেনে। কেউ দামাদামি করছে, কেউ গরুর দাঁত দেখছে, কেউ খেজুরের রস খাওয়াচ্ছে। দাদু একটা বড় কালো গরু পছন্দ করলেন। এইটাই নেব। ফায়াজ গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। গরুটার বড় বড় শান্ত চোখ দেখে তার কেমন মায়া লাগল।
হাট থেকে ফেরার পথে তারা নদীর ঘাটে থামল।
সেখানে হঠাৎ আবার দেখা হয়ে গেল মেহরিনের সঙ্গে। সে কলসি নিয়ে পানি তুলছিল। দাদু মুচকি হেসে বললেন, মেহরিন মা, ফায়াজরে একটু গ্রাম ঘুরাইয়া দেখাস তো। শহরের পোলা সব ভুলে গেছে। মেহরিন হেসে মাথা নাড়ল। সেদিন বিকেলে তারা দুজন নদীর ধারে হাঁটতে বের হলো। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। বাতাসে কাশফুল দুলছে। মেহরিন বলল, আপনি শহরে থাকেন, গ্রামের কথা কি মনে পড়ে? ফায়াজ একটু চুপ করে থেকে বলল, আগে পড়ত না। কিন্তু এখন পড়ে।
কেন?
ফায়াজ তার দিকে তাকাল। হয়তো কিছু মানুষকে দেখে। মেহরিন চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল। সেই দিন থেকে তাদের প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতে লাগল। কখনো পুকুরপাড়ে, কখনো আমবাগানে, কখনো সন্ধ্যার পর ছাদে। ফায়াজ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, শহরের এত মেয়ের মাঝে থেকেও এমন শান্তি সে কখনও অনুভব করেনি। মেহরিনের মাঝে একটা অদ্ভুত সরলতা আছে। একদিন রাতের বেলা বিদ্যুৎ চলে গেল। চারপাশ অন্ধকার। আকাশভরা তারা। ফায়াজ বাড়ির উঠোনে বসে ছিল। ঠিক তখন মেহরিন এল দাদির কাছে কিছু নিতে। দাদি ভেতরে যেতেই তারা দুজন একা হয়ে গেল।
মেহরিন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, শহরে কি এত তারা দেখা যায়? না। শহরে মানুষ এত ব্যস্ত যে আকাশ দেখার সময়ই পায় না। মেহরিন মৃদু হেসে বলল, —“আপনি আবার চলে গেলে গ্রামটা ফাঁকা লাগবে।” ফায়াজ বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান অনুভব করল। আমি যদি না যাই? মেহরিন চুপ হয়ে গেল। বাতাসে কদম ফুলের গন্ধ ভাসছিল। হঠাৎ দূরে বজ্রপাত হলো। তারপর ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো। দুজন দৌড়ে বারান্দায় আশ্রয় নিল। মেহরিনের চুল ভিজে কপালে লেগে গেছে। ফায়াজ তাকিয়ে থাকতে থাকতে যেন হারিয়ে গেল। মেহরিন ধরা গলায় বলল, “এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? ফায়াজ আস্তে করে বলল, কারণ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। মেহরিন কিছু বলল না। শুধু চোখ নামিয়ে হাসল। সেই রাতেই ফায়াজ বুঝে গেল—সে প্রেমে পড়েছে।
ঈদের আগের দিন পুরো গ্রাম যেন উৎসবে মেতে উঠল। বাড়িতে বাড়িতে সেমাই ভাজা হচ্ছে। শিশুরা নতুন জামা পরে ঘুরছে। মসজিদের মাইক থেকে তাকবির ভেসে আসছে। ফায়াজ আর মেহরিন বিকেলে বাঁশবাগানের পাশে হাঁটছিল। মেহরিন হঠাৎ বলল, আপনি তো ঈদের পর চলে যাবেন, তাই না?  প্রশ্নটা শুনে ফায়াজ থেমে গেল। কেন জানি বুকটা ভারী হয়ে উঠল। যেতে হবে হয়তো।” তারপর? তারপরও হয়তো তোমাকে ভুলতে পারব না। মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল। আমি শহরের মানুষদের বিশ্বাস করি না। আমি আলাদা। সবাই প্রথমে এটাই বলে। ফায়াজ ধীরে ধীরে তার হাত ধরল। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে কষ্ট দেব না। মেহরিন কাঁপা গলায় বলল, কথা ভাঙবেন না যেন।
ঈদের সকাল। গ্রামের ঈদের সকাল যেন অন্যরকম পবিত্র। ফজরের পর থেকেই চারদিকে তাকবির ধ্বনি। সবাই নতুন পাঞ্জাবি পরে ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে। বাতাসে মাটির গন্ধ আর রান্নার সুবাস। ফায়াজ সাদা পাঞ্জাবি পরে দাদুর সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়তে গেল। নামাজ শেষে সবাই কোলাকুলি করছে। দাদুর মুখে আনন্দের হাসি। কোরবানির সময় ফায়াজ গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া পড়ল। তার মনে হচ্ছিল, এই ত্যাগের মধ্যেই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। বিকেলে মেহরিনদের বাড়ি থেকে দাওয়াত এলো।
মেহরিন গোলাপি জামা পরেছিল। তাকে দেখে ফায়াজের চোখ আটকে গেল। খাওয়ার পর সন্ধ্যায় তারা বাড়ির পেছনের মাঠে গেল।
চারপাশে জোনাকি উড়ছে। মেহরিন ধীরে বলল,এই ঈদটা আমি কোনোদিন ভুলব না। ফায়াজ তার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও না। তারপর সাহস করে বলল, মেহরিন… আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাতাস যেন এক মুহূর্ত থেমে গেল। মেহরিনের চোখ কেঁপে উঠল। সত্যি? হ্যাঁ। খুব বেশি। মেহরিনের ঠোঁটে কাঁপা হাসি ফুটল। আমিও। সেই মুহূর্তে দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এলো তাকবির ধ্বনি। ফায়াজের মনে হলো, পৃথিবীর সব সুখ যেন এই ছোট্ট গ্রামের রাতেই লুকিয়ে আছে।
কিন্তু সুখের মুহূর্তগুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। ঈদের দুই দিন পর ফায়াজের শহরে ফেরার দিন চলে এলো। সকাল থেকেই তার মন খারাপ। দাদি বারবার খাবার গুছিয়ে দিচ্ছেন। দাদু চুপচাপ বসে আছেন। আর মেহরিন? সে কোথাও নেই। বাস ছাড়ার ঠিক আগে ফায়াজ নদীর ঘাটে গেল। মনে হচ্ছিল, একবার অন্তত তাকে দেখা দরকার। সেখানে গিয়ে দেখল, মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে। চোখ লাল।
ফায়াজ কাছে গিয়ে আস্তে বলল, রাগ করেছ? মেহরিন মাথা নাড়ল। না। তাহলে কাঁদছ কেন? সে কষ্টভরা হাসি দিল। সবাই তো একদিন চলে যায়। ফায়াজ ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা খাম বের করল। এটা তোমার জন্য। মেহরিন খুলে দেখল, ভেতরে একটা ছবি। পুকুরপাড়ে দাঁড়ানো তার অজান্তে তোলা ছবি। পেছনে লেখা শহরে ফিরে গেলেও আমার গ্রামের নাম হবে মেহরিন। মেয়েটার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফায়াজ আস্তে করে বলল, আমি আবার আসব। সত্যি? হ্যাঁ। শুধু ঈদে না… তোমার জন্য। বাসের হর্ন ভেসে এলো দূর থেকে। ফায়াজ ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
মেহরিন তখনও দাঁড়িয়ে। বাতাসে তার ওড়না উড়ছে। গ্রামের আকাশে তখন বিকেলের নরম আলো। নদীর পানি চিকচিক করছে। আর সেই দৃশ্যটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে, যে অজান্তেই একটা শহুরে ছেলের হৃদয়কে গ্রামে বেঁধে ফেলেছে চিরদিনের জন্য।