অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা এআই নির্ভর পুলিশিংয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত হয়েছে- সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি ও নগর নিরাপত্তাজনিত হুমকি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়াচ্ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জনসেবা কার্যক্রম আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে এ উদ্যোগকে বড় ধরনের রূপান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ এপ্রিল পুলিশিং আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নয়টি নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। নতুন এআইভিত্তিক প্রযুক্তিগুলো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান—হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে।

এসব ব্যবস্থায় উন্নত ভিডিও বিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা সম্ভব হবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ সংগ্রহ এবং ই-প্রসিকিউশন পরিচালনার সুবিধা থাকায় মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমবে এবং আইন প্রয়োগের দক্ষতা বাড়বে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে উন্নত প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তিনি জানান, অপরাধ এখন ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর ও জটিল হয়ে উঠছে, তাই বাহিনীকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য এআই ব্যবহারের প্রসার অপরিহার্য।

স্মার্ট সিসিটিভি ব্যবস্থাতেও যুক্ত হয়েছে এআই প্রযুক্তি। এসব ক্যামেরা সন্দেহজনক চলাফেরা, পরিত্যক্ত বস্তু কিংবা সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম। উন্নত ভিডিও শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় অস্ত্র বা সহিংস আচরণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে। পাশাপাশি সেন্সরভিত্তিক প্রযুক্তি গুলির শব্দ শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে, যা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক।

প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এআইনির্ভর পুলিশিং জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা ও নরসিংদীতে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ডিপফেক কনটেন্ট, মানহানিকর ভিডিও ও জাল সরকারি নথি তৈরির অভিযোগ রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব গ্রেপ্তার ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার মতো অপরাধ দমনে চলমান দেশব্যাপী অভিযানের অংশ। নতুন আইনি বিধান অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি বা প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি ছড়ালে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগে অঙ্গীকার জোরদার করেছে বাংলাদেশ। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট ২০২৬’-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরেন। এদিকে নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে চালু হয়েছে একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ‘হ্যালো সিটি’, ‘রিপোর্ট টু বিজিবি’, ‘হেল্প’ এবং ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’-এর মাধ্যমে নাগরিকরা সহজে অভিযোগ জানাতে পারছেন। পাশাপাশি ‘৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা’ এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তবে পুলিশিংয়ে এআই ব্যবহারের বিস্তার নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা গণনজরদারি, তথ্যের গোপনীয়তা ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তারা স্বচ্ছ নীতিমালা, জবাবদিহিতা ও নৈতিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সব মিলিয়ে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে জননিরাপত্তা জোরদার ও দ্রুত সেবাদানে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।