কন্যাসন্তানের প্রতি অবহেলা নয়


অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় : জুলাই ৯, ২০২৪ । ১১:২২ পূর্বাহ্ণ
কন্যাসন্তানের প্রতি অবহেলা নয়
আল্লাহ তায়ালা মানুষের খালিক ও মালিক। মানুষকে তিনিই সৃষ্টি করেন এবং তিনিই মানুষের মালিকানার দাবিদার। বাবা-মা সন্তানের খালিক নন, মালিকও নন। তারা সন্তানের পৃথিবীতে আগমনের মাধ্যম মাত্র। আল্লাহ চাইলে স্বামী-স্ত্রীর কোলে পুত্রসন্তান দিতে পারেন, চাইলে কন্যাসন্তান দিতে পারেন।
এখানে বাবা-মায়ের বা স্বামী-স্ত্রীর কোনো হাত নেই। কন্যাশিশু বাবা-মায়ের জন্য পার্থিব ও পরকালীন সৌভাগ্য বয়ে আনে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল,
অতঃপর সে ওই কন্যাকে কষ্ট দেয়নি, কন্যার ওপর অসন্তুষ্টও হয়নি এবং পুত্রসন্তানকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি, তা হলে ওই কন্যার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবশে করাবেন।’ (মুসনাদ আহমদ : ১/২২৩)
কন্যাসন্তানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পরিবারে সুখ ও বরকত দান করেন। পুত্রসন্তান যেমন আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত, তেমনি কন্যাসন্তানও আল্লাহর নেয়ামত। পুত্র সন্তানের যেমন প্রয়োজন আছে, কন্যাসন্তানেরও তেমনি প্রয়োজন আছে। পুরুষ নারীর মুখাপেক্ষী, নারী পুরুষের মুখাপেক্ষী।
উভয়ের সৃষ্টি ও জন্মগ্রহণ আল্লাহ তায়ালার বিশেষ হেকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিতÑরাসুল (সা.) বলেন, ‘যার তিনটি কন্যাসন্তান থাকবে এবং সে তাদের কষ্ট-যাতনায় ধৈর্য ধরবে,
সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! যদি দুজন হয়? উত্তরে তিনি বললেন, দুজন হলেও। লোকটি আবার প্রশ্ন করল, যদি একজন হয় হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, একজন হলেও।’ (বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান : ৮৩১১)
সমাজে কিছু মুসলমান ভাই আছেন, যারা তাদের পুত্রসন্তান জন্মলাভ করলে খুব আনন্দ প্রকাশ করেন। উৎসাহের সঙ্গে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয় মানুষদের ‘ছেলে হওয়ার’ খবর জানান।
খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করেন। খুব গুরুত্ব ও জাঁকজমকের সঙ্গে আকিকার আয়োজন করেন। পক্ষান্তরে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে সেই ভাইয়েরা কোনো খুশি প্রকাশ করেন না! কারও সঙ্গে ‘মেয়ে হওয়ার’ কথা আলোচনা করতে চান না।
কেউ জিজ্ঞাসা করলে নিচু আওয়াজে অসহায়ের মতো বলেন, ‘আমার মেয়ে হয়েছে।’ অনেক সময় মেয়ে হওয়ার কারণে স্বামী তার স্ত্রীর ওপর অসন্তুষ্ট হয়। স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কন্যাসন্তান হলে তালাকের ধমকির ঘটনাও শোনা যায়।
কারও এক-দুটি কন্যাসন্তান হওয়ার পর স্বামী তার স্ত্রীকে এ কথা বলে দিয়েছে, যদি এবারও তোমার মেয়ে হয় তা হলে তোমাকে তালাক দিয়ে দেব। নাউযুবিল্লাহ এ কেমন ধৃষ্টতা! কেমন বাড়াবাড়ি! যেন কন্যাসন্তানের স্রষ্টা এই নারী নিজে! পুত্র বা কন্যা হওয়া যেন তার ইচ্ছাধীন!

 

এ ধরনের কাজ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। এটা আল্লাহ তায়ালার হেকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের ওপর আপত্তি করার নামান্তর। এটি ইসলামপূর্ব বর্বর জাহেলি যুগের কুপ্রথা। এমন কাজে আল্লাহ তায়ালা ভীষণ অসন্তুষ্ট হন। তাই আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘
যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে।
সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে নাকি তাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। ভেবে দেখো, সে কত নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল’ (সুরা নাহল : ৫৮-৫৯)।

আয়াতে কন্যাসন্তানের জন্মের সংবাদকে ‘সুসংবাদ’ বলা হচ্ছে। তাদের জাহেলি কর্মকাণ্ড ও মানসিকতার শুধু নিন্দাই করা হয়নি বরং তারা যেটাকে দুঃসংবাদ মনে করছে সেটাকে ব্যক্তই করা হয়েছে ‘সুসংবাদ’ বলে।

সঙ্গে সঙ্গে মুমিনদের মধ্যেও যেন এ জাহেলি মানসিকতার দুর্গন্ধও না থাকে সে জন্য আল্লাহ আয়াতের শেষে বললেন, ‘ভেবে দেখো, সে কত নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল!’
রাসুল (সা.) তার কন্যাদের অনেক বেশি ভালোবাসতেন। কন্যারা ছিল তার আদরের দুলালি। আজীবন তিনি কন্যাদের ভালোবেসেছেন এবং কন্যাসন্তান প্রতিপালনে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন।
কন্যাসন্তান লালন-পালনে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কন্যাসন্তান লালন-পালনের ব্যাপারে যে পরিমাণ ফজিলতের কথা উল্লেখ করেছেন, পুত্র সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে সে পরিমাণ বলেননি।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিতÑরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির তিনজন কন্যাসন্তান বা তিনজন বোন আছে আর সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছে, তাদের নিজের জন্য অসম্মানের কারণ মনে করেনি, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (তিরমিজি : ১৯১২)। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
‘যে ব্যক্তির তিনজন কন্যাসন্তান বা তিনজন বোন আছে অথবা দুজন কন্যা সন্তান বা বোন আছে, সে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করেছে তা হলে তার জন্য রয়েছে জান্নাত’ (তিরমিজি : ১৯১৬)।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিতÑরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সে ধৈর্যের সঙ্গে তা সম্পাদন করেছে সেই কন্যাসন্তান তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (তিরমিজি : ১৯১৩)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, আমার কাছে এক নারী এলো। তার সঙ্গে তার দুই মেয়ে। আমার কাছে সে কিছু চাইল। কিন্তু একটি খেজুর ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই ছিল না।
আমি তাকে সেটি দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করল এবং তা দুই টুকরো করে তার দুই মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিল। কিন্তু তা থেকে সে নিজে কিছুই খেল না। তারপর ওই নারী ও তার মেয়ে দুটি উঠে চলে গেল। ইত্যবসরে আমার কাছে রাসুল (সা.) এলেন।
আমি তাঁর কাছে ওই নারীর কথা বললাম। নবীজি (সা.) বললেন, ‘যাকে কন্যা দিয়ে কোনো কিছুর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয় আর সে তাদের প্রতি যথাযথ আচরণ করে, তবে তা তার জন্য আগুন থেকে রক্ষাকারী হবে’ (মুসলিম : ৬৮৬২; মুসনাদ আহমদ : ২৪৬১৬)।
এ জন্য আমাদের সবার উচিত হলো যাদের কন্যাসন্তান আছে, তাদের আল্লাহর উপহার ভেবে কন্যাসন্তানদের প্রতিপালন করা, হৃদয় উজাড় করে কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা। আর যাদের কন্যাসন্তান নেই কন্যাসন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
সূত্র: স/ আলো

পুরোনো সংখ্যা

শনি রবি সোম মঙ্গল বু বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০৩১