বগুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পই যেন আশ্রয়হীন করার প্রক্রিয়া


আল-আমিন
প্রকাশের সময় : জুন ২৪, ২০২৪ । ৮:০৫ অপরাহ্ণ
বগুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পই যেন আশ্রয়হীন করার প্রক্রিয়া
প্রতীকী ছবি

* “ক” শ্রেণির গৃহ বিতরণে পিতা-পুত্র সহ ৩টি উপকারভোগী পরিবারের পূর্ব থেকেই ক্রয় ও পিতা-মাতা সূত্রে বাসস্থানের জমি রয়েছে।

* ঘোড়দৌড় গ্রামে মোঃ আব্দুল জলিলের পরিবারকে যেন আশ্রয়হীন করার প্রক্রিয়া হয়ে দাড়িয়েছে।

* প্রকল্পের গৃহ বিতরণে অনিয়মেই শেষ নয়, আর্থিক দুর্নীতির কথাও জানান ভুক্তভোগী আব্দুল জলিলের পরিবার।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল বাংলার গরীব দুঃখী নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার। এ লক্ষ্যে তিনি অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে অন্তর্ভুক্ত করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর) চরপোড়াগাছা গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং গৃহহীন মানুষের গৃহ নির্মাণের নির্দেশ প্রদান করেন। তারই নির্দেশে শুরু হয় গৃহহীন পুনর্বাসন কার্যক্রম।

১৯৭২ সালের ৩ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “আমার দেশের প্রতি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে- এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন”।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৯৯৭ সালের ২০ মে কক্সবাজার জেলার ঘূর্ণিঝড়ে আক্রান্ত মানুষের দূর্দশা দেখতে কক্সবাজার পরিদর্শন করেন এবং গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের নির্দেশ প্রদান করেন। তার নির্দেশনার প্রেক্ষিতে শুরু হয় আশ্রয়ণ প্রকল্প। আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে মুজিব শতবর্ষে “বাংলাদেশে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না” মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনায় দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের বাসস্থান নিশ্চিতকল্পে এবং ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। যা “মুজিব শর্তবর্ষ উপলক্ষে দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য গৃহ প্রদান নীতিমালা-২০২০” নামে অভিহিত।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী উপকারভোগী “ক” এবং “খ” দুই শ্রেণির পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে। “ক” শ্রেণির পরিবারে সামগ্রিকভাবে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল, অসহায় দরিদ্র অর্থাৎ যাদের জমি ও ঘর কিছুই নেই, তাদেরকে আওতাভুক্ত করা হয়। এই পরিবারকে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সরকারি খাস জমিতে গৃহ বা ঘর নির্মাণ করা হবে। অপরদিকে “খ” শ্রেণির পরিবারে সামগ্রিকভাবে যার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জমির সংস্থান আছে কিন্তু ঘর নেই, তাদেরকে আওতাভুক্ত করা হয়। এই পরিবারকে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে উপকারভোগীর নিজ জমিতে গৃহ বা ঘর নির্মাণ করা হবে। উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তিগণকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়।

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া জেলার শেরপুর উপজেলায় সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যমতে ৪৩টি প্রকল্প স্থানের মাঝে ৪৯৬টি উপকারভোগী পরিবারের তথ্য পাওয়া যায়। এর মাঝে উপজেলাধীন খামারকান্দি ইউনিয়নের ঘোড়দৌড় গ্রামে বাস্তবায়িত প্রকল্পে গৃহ বিতরণে অনিয়মের পাশাপাশি আশ্রয়হীন করার অভিযোগ উঠেছে।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ঘরের দৃশ্যমান স্থানে উপকারভোগীর পরিচিতি ও অর্থবছর উল্লেখ করে প্রকল্প কার্যালয় হয়ে প্রদত্ত নমুনা মোতাবেক ফলক স্থাপন করার বিষয় উল্লেখ্য থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে নির্মিত কোন ঘরেই ফলক স্থাপন পাওয়া যায়নি।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঘোড়দৌড় গ্রামে বাস্তবায়িত প্রকল্পে (দাগ নং ২৪৯১) “ক” শ্রেণির গৃহ বিতরণে পিতা-পুত্র সহ ৩টি উপকারভোগী পরিবারের পূর্ব থেকেই ক্রয় ও পিতা-মাতা সূত্রে বাসস্থানের জমি রয়েছে, যার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। যা প্রকল্প স্থাপনের পার্শ্ববর্তী জমি এবং সকলের একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত।

ঘোড়দৌড় মৌজার খতিয়ান নং ৭৪ জে,এল, নং ১৩৩ দাগ নং ২৪৯২ তে দেখা যায়, আনিছা বিবি (স্বামী- আবুল কালাম), আব্দুল হাকিম, ছামছুল হক (উভয়ের পিতা- আবুল কালাম) ৩ ব্যক্তির নামে ১.৪ শতক করে এবং জহুরা বিবি (স্বামী- নবীর উদ্দিন) এর ২.৮ শতক মোট ৭ শতক জমি রয়েছে। যা জমির শ্রেণি হিসেবে টিন দ্বারা নির্মিত বাড়ি উল্লেখ্য রয়েছে।

তথ্য নিয়ে জানা যায়, আনুমানিক ২০০৯-১০ সালে আনিছা বিবি’র ১.৪ শতক ও ছামছুল হকের ১.৪ শতক করে মোট ২.৮ শতক ক্রয় করে নেন আব্দুল হাকিম। অর্থাৎ উক্ত খতিয়ানে আব্দুল হাকিমের মোট ৪.২ শতক জমি রয়েছে।

তথ্য নিয়ে আরও জানা যায়, ২০২০ সালের ১৪ মার্চে তৎকালীন খামারকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল ওহাব সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহহীনের তালিকা চূড়ান্ত ভাবে বিবেচিত “ক” এবং “খ” শ্রেণি ভুক্ত ২টি পৃথক তালিকা করেন। যেখানে “খ” শ্রেণি ভুক্ত অর্থাৎ যার জমি আছে কিন্তু ঘর নেই এমন তালিকায় ঘোড়দৌড় গ্রামের মৃত লবির উদ্দিনের স্ত্রী মোছাঃ জহুরা খাতুনের নাম রয়েছে।

পরবর্তীতে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ৪র্থ পর্যায়ে বাস্তবায়িত ঘোড়দৌড় গ্রামে “ক” শ্রেণির গৃহ বিতরণে সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল ওহাবের “খ” শ্রেণির চূড়ান্ত তালিকা ও উক্ত ৭৪ নং খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত জহুরা খাতুনের এক মাত্র ছেলে মোঃ জহুরুল ইসলাম (পিতা- মৃত লবির হোসেন প্রাং এবং স্ত্রী- মোছাঃ নারজিনা খাতুন) এবং নাতি মোঃ শাহাদত হোসেন (পিতা- জহুরুল ইসলাম এবং স্ত্রী- মোছাঃ চাঁদনী খাতুন) এর উভয়ের নামে ১টি করে মোট ২টি গৃহ বিতরণ করা হয়েছে। অপরদিকে উক্ত ৭৪ নং খতিয়ানে অন্তর্ভূক্ত মোঃ আব্দুল হাকিম (পিতা- মৃত আবুল হোসেন আকন্দ এবং স্ত্রী- মোছাঃ অকিতন নেছা) এর নিজ নামীয় জমি থাকার পরও তাকেও ১টি গৃহ বিতরণ করা হয়েছে।

উক্ত আলোচিত ব্যক্তিদ্বয়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজ নাম সহ পিতা-মাতার নাম একেক কাগজপত্রে কিছু অংশ ভিন্ন লক্ষ্য করা যায়। তবে একেক কাগজপত্রে একেক ধরণের নাম হলেও ব্যক্তিদ্বয়গুলো একই ব্যক্তি।

স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, উক্ত স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার দীর্ঘ ১ যুগ পূর্ব থেকেই কয়েকটি পরিবার বাসস্থান হিসেবে গৃহ নির্মান করে বসবাস করে আসছিল। যাদের মাঝে মোঃ আব্দুল জলিল ও সাহিন (উভয়ের পিতা- মোঃ আব্দুস ছাত্তার, মাতা- মোছাঃ জামিলা বেগম) স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছিল। সেই স্থান থেকে উচ্ছেদ হওয়া সাহিন তার স্ত্রী রশিদা খাতুন ও ১ ছেলে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিলেও আশ্রয় হয়নি মোঃ আব্দুল জলিলের পরিবারের। আব্দুল জলিলের পরিবারে স্ত্রী মোছাঃ শারমীন খাতুন ও ২ ছেলে রয়েছে।

আব্দুল জলিল দিন-মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তার নামীয় বা পিতা-মাতা সূত্রে কোন ধরণের জমি-জমা নেই। অর্থাৎ সে সামগ্রিকভাবে ভূমিহীন। এখন গৃহহীন হয়ে সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চরম হতাশা আর অনিশ্চিত ভবিষতের মধ্য দিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। অসহায় হয়ে পড়া এই পরিবারের পাশে এখন নেই কেউ।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য যেখানে দেশের সকল ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীনের পুনর্বাসন করা, সেখানে ঘোড়দৌড় গ্রামে মোঃ আব্দুল জলিলের পরিবারকে যেন আশ্রয়হীন করার প্রক্রিয়া হয়ে দাড়িয়েছে।

প্রকল্পের গৃহ বিতরণে অনিয়মেই শেষ নয়, আর্থিক দুর্নীতির কথাও জানান ভুক্তভোগী আব্দুল জলিলের পরিবার। ভুক্তভোগী আব্দুল জলিল বলেন- “ মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভূমিহীনদের ঘর বিতরণ করা হয়েছে। যার জন্যই জমি-জমা থাকার পরও ভূমিহীনদের ঘর পেয়েছে কয়েকজন। আমার থেকেও ঘর দেওয়ার জন্য টাকা নিয়েছিল। কিন্তু আমার চেয়ে বেশি পরিমাণে টাকা অন্যরা দেওয়ার জন্য আমার টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। আমি ভূমিহীন হয়েও আমাকে ঘর দেওয়া হয়নি, কিন্তু টাকার বিনিময়ে ঠিকই অন্যদের ঘর দিয়েছে। ”

বগুড়া জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোছাঃ আফসানা ইয়াসমিন জানান, “ক” শ্রেণি পরিবারের জন্য বাস্তবায়িত গৃহ বিতরণে “খ” শ্রেণির পরিবারের গৃহ পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। যদি এই ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ ও অভিযুক্ত পরিবারের গৃহের বরাদ্দ বাতিল করা হবে।

পুরোনো সংখ্যা

শনি রবি সোম মঙ্গল বু বৃহ শুক্র
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০