বেইলি রোড: স্বপ্নের বাসস্থান, আজ দুঃস্বপ্নের আঁতুড়ঘর


আল-আমিন
প্রকাশের সময় : মার্চ ২, ২০২৪ । ২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
বেইলি রোড: স্বপ্নের বাসস্থান, আজ দুঃস্বপ্নের আঁতুড়ঘর

ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক স্থান বেইলি রোড, যা একদিন স্বপ্ন ও আবেগের মেলবন্ধনের প্রতীক ছিল। যা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) রাত পৌনে ১০টার দিকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর দুঃস্বপ্নের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। বহুতল ভবনটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়ার পর ৪৬ জনের প্রাণহানি সহ অসংখ্য মানুষ আহত এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা চিকিৎসকদের। এই ঘটনা লাইভ নিউজে দেখে মনে হচ্ছিল এক অসম্ভব দুঃস্বপ্ন। ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে যাওয়া পরিবারগুলোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা তাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করবে।

অভিজাত শপিং মলের জন্য সুনাম রয়েছে বেইলি রোডের। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য ‘গ্রিন কজি কটেজ’। যার সাততলা ভবনের একটি ছাড়া সব তলাতেই রেস্টুরেন্ট। এরমধ্যে বড় রেস্টুরেন্ট তিনটি। এছাড়া একই ভবনে একটি বিখ্যাত পাঞ্জাবির দোকান, মোবাইল ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের একাধিক শোরুম। অভিজাত এলাকার অভিজাত ভবনে ছিল হরেকরকম খাবারের সমাহার, বিনোদন। তাই নাগরিক ব্যস্ততার ফাঁকে মানুষ ছুটে যান সেখানে- খেতে, গল্প-আড্ডায় মশগুল হতে। কিন্তু ভবনের ছিল না নিরাপত্তা। ঘটনার দিন ‘লিপ ইয়ারের লিপ ডে’ হওয়ায় দিনটি স্মরণীয় করার লক্ষ্যেই তিন রেস্টুরেন্টেই খাচ্ছিলেন অন্তত হাজারখানেক মানুষ। তখন হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। সব যখন শেষ, তখন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বললেন, ‘ভবনটি ছিল বিপজ্জনক। প্রতিটি ফ্লোরেই গ্যাসের সিলিন্ডার ছিল। এমনকি সিঁড়িতেও ছিল।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ‘রিল’ ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেখানে দেখা যায় আগুনের সূত্রপাত। সেই সময়েই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভিডিওটি ধারণ করে ছিলেন। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলার একপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে আগুনের লেলিহান শিখা। তখনও বেইলি রোডে রাতে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড়। কেউ কেউ রিকশা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ওই আগুন দেখছেন, কেউ আবার রাস্তা পার হয়ে আগুনের দিকেই ছুটছেন। তখনও আগুন নিচতলাতেই ছিল। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন দ্রুত ভবনের উপরের দিকে উঠতে থাকে। কীভাবে ভবনটিতে আগুন দ্রুত ছড়ালো, তা উঠে এসেছে প্রাথমিক তদন্তে।

বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, প্রত্যক্ষদর্শী রায়হান নামক এক যুবক বলেন, ‘আমি বাসায় ফিরছিলাম। পাশের গলি দিয়ে আমি মগবাজারের দিকে বের হবো। হঠাৎ দেখলাম আগুন। খুব বড় না, কিন্তু বেশ লেলিহান। নিচতলায় একটা চায়ের দোকান, সেখানেই আগুনটা লেগেছে। আমি এক দুই মিনিটের মধ্যে স্থান ত্যাগ করি। বাসায় ফিরে রাতে যখন টিভি দেখছি, তখন দেখি পুরো ভবনই শেষ।’

শুক্রবার র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশীদ হোসেন ঘটনাস্থলে সংবাদকর্মীদের জানান, ‘নিচতলায় একটা ছোট দোকান ছিল, সেখান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়েছে। এখানে অধিকাংশ যেহেতু রেস্টুরেন্ট ছিল, সেহেতু অনেক গ্যাস সিলিন্ডারও ছিল। সেগুলোতেই আগুন ছড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে তা-ই ধারণা করা হচ্ছে।’

ভবনটির প্রতিটি ফ্লোর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘুরে ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইসাব) জেনারেল সেক্রেটারি জাকির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ভবনটিতে যে ফায়ার অ্যালার্মিং ও অগ্নিনিরাপত্তা থাকার কথা, তার ন্যূনতম ব্যবস্থাও ছিল না। প্রতিটি ফ্লোরে ওঠার যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল সংকুচিত। আর যা ব্যবস্থা ছিল সেটিও ব্যবহার করতে পারেনি। ফলে নিচ থেকে উপরের দিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। ইমারজেন্সি কোনও দরজা ছিল না। সিঁড়ির পাশেই গ্যাস সিলিন্ডার পড়ে থাকতে দেখেছি। এমনকি অগ্নিনির্বাপণের যে যন্ত্রগুলো রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি।’

সাধারণ নাগরিকের মনে এখন প্রশ্ন, ঘূর্ণিঝড়ের মত এক অগ্নিঝড়ে এতগুলো প্রাণহানি হওয়ার পরে কেন জানা গেলো, ভবনটি নিরাপদ ছিল না? ফায়ারের ডিজি যাকে ‘বিপজ্জনক’ ভবন বলেছেন, তেমন ভবন কি এই শহরে একটাই ছিল নাকি পুরো শহরেই বিদ্যমান? বেইলি রোডের গ্রিন কজি কটেজ ভবন ব্যতিত বাকি ভবনগুলো কি বিপদমুক্ত?

বার্তা সংস্থা রয়টার্স’র সূত্র মতে, গার্মেন্টসের বাইরে অন্যান্য শিল্পগুলো বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতিকে যে হারে ফুলে-ফেঁপে উঠতে সাহায্য করছে, সে হারে এসব খাতে নিরাপত্তায় জোর দেওয়া হচ্ছে না। ফলাফল হিসেবে গত কয়েক বছরে অগ্নিঝড়ে প্রাণহানি হয়েছে শতশত মানুষের।

রাজধানীতে চালু হয়েছে হাজার হাজার রেস্টুরেন্ট। এসব রেস্টুরেন্টের মধ্যে যারাই নাম করেছে, তারাই খুলেছে একাধিক শাখা। এর মাঝে অসংখ্য অনিরাপদ রেস্টুরেন্ট রয়েছে যেখানে মুনাফার লোভে মানুষের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া হয়। বেইলি রোডের বিস্ফোরণ এই অবাস্তব সত্যের প্রমাণ।

বর্তমান সময়ে নগরীতে একজন মানুষের নিশ্বাস নেওয়ার মতো খালি জায়গা পাওয়া সম্ভব হয় না। যার ফলে অজানা অনিরাপদ রেস্টুরেন্টগুলোই হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের আড্ডাখানা। পরিবারের সদস্যদের মতোই সেখানকার কর্মীরা হয়ে উঠেছেন আপনজন। কিছু সময় আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বাদের সঙ্গে মিলিয়ে খাওয়া যায় মুখরোচক খাবার। যেখানে নাগরিকরা প্রিয়জনদের নিয়ে যান একটু ‘ভালো সময়’ কাটাতে, আর সেখানেই এমন মৃত্যু যন্ত্রণা!

শহরের প্রায় সব এলাকাতেই এমনভাবে কিছু ভবন নতুন করে তৈরি হয়েছে বা পুরাতন ভবনকে সংস্কার করা হয়েছে, যাতে ওই ভবনের সবগুলো তলাতেই হয়েছে রেস্টুরেন্ট। যেন পশুর হাটের মতো রেস্টুরেন্টের ‘হাট’।

বেইলি রোডের এই ঘটনায় জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে লিখেছে, ‘নিরাপত্তার অভাবে কারখানা এবং বাসভবনে আগুনের ঘটনা বাংলাদেশে নিয়মিত এবং কুখ্যাত হয়ে উঠেছে।’

এই বেদনাদায়ক ঘটনা ঢাকা শহরের জন্য একটি সতর্কতা। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে সকলকেই সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই ঘটনার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় বেইলি রোড ট্র্যাজেডির মতো আরও অন্য কোনো ট্র্যাজেডির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হবে সাধারণ মানুষের। যার মাঝে থাকতে পারি আপনি, আমি বা আপনার আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব।

এই ঘটনায় সকল নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।

লেখক,
সহকারী বার্তা সম্পাদক, দৈনিক ভোরের চেতনা
কার্যনির্বাহী সদস্য, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ

পুরোনো সংখ্যা

শনি রবি সোম মঙ্গল বু বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১